বাইবেলের গল্প

পৌলের প্রচার যাত্রা

সিরিয়া দেশের আন্তিয়খিয়া শহরে অনেক লোক যীশু খ্রীষ্টকে বিশ্বাস করে খ্রীষ্টিয়ান হচ্ছিল। তাই সেখানে যীশুর বিষয় শিক্ষা দেবার জন্য তাদের একজন শিক্ষক প্রয়োজন ছিল। বার্ণবা যিরূশালেম থেকে এসে তাদের সাহায্য করতে লাগলেন। ইতিমধ্যে পৌল-তার বাড়ী তর্শীশে চলে গিয়েছিলেন তাই বার্ণবা গিয়ে তাকে আন্তিয়খিয়াতে নিয়ে আসলেন।
এই দু’জন লোকের জীবনে ঈশ্বরের বিশেষ পরিকল্পনা ছিল। ঈশ্বর মন্ডলীর নেতাদের বললেন, ‘বার্ণবা ও পৌলের জন্য আমার বিশেষ কাজ রয়েছে। তারা সেসব লোকদের কাছে যাবে যারা এখনও সুখবর শোনে নি।’
তারা প্রথমে সাইপ্রাস দ্বীপে গেলেন যেখানে বার্ণবা জন্মেছিলেন। সেই দ্বীপের শাসনকর্তা তাদের স্বাগতম জানালেন। তিনি তাদের কাছ থেকে যীশুর সুখবর শুনলেন। তিনি যীশুর একজন অনুসারী হলেন। এই শুরুটা ছিল খুবই ভাল।
সেখান থেকে তারা জাহাজে তুরষ্ক দেশে গেলেন। তারা সারাদেশ পায়ে হেঁটে এক শহর তেকে অন্য শহরে যেতেন।
তারা সবসময়ই প্রথমে যিহূদীদের কাছে সুখবর প্রচার করবার জন্য যিহূদীদের সমাজ-ঘরে যেতেন। সেখানের অল্প লোকই তাদের কথা বিশ্বাস করত। তারা এই কথা বিশ্বাস করতে অস্বীকার করল যে, যীশুই ছিলেন ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞা-করা রাজা। এই যিহূদীরা প্রায়ই তাদের বিপদে ফেলতে চেষ্টা করত। পৌল ও বার্ণবা সেখান থেকে গোপনে একদিন পালিয়ে এলেন।
কিন্তু প্রায় প্রত্যেক শহরে কিছু কিছু লোক মনোযোগ দিয়ে যীশুর বিষয় শুনত ও তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করত। পৌল ও বার্ণবা অন্য জায়গায় যাবার আগে সেসব নতুন খ্রীষ্ট বিশ্বাসী দলের জন্য নেতা বাছাই করে দিতেন।
তারা আবার আন্তিয়খিয়ায় ফিরে এলেন। তাদের যাত্রাপথে কি কি ঘটেছিল তা সেখানকার খ্রীষ্ট বিশ্বাসীদের বললেন। পৌল আবার বাইরে প্রচারে বের হবার সময় সাইলাসকে বেছে নিলেন। তারা গেলেন তুরস্কেও লূস্ত্রা শহরে। সেখানে তারা তীমথি নামে এক যুবকের দেখা পান। তারা সেখানকার সব জায়গায় প্রচার করলেন। তারা ভাবছিলেন এরপর কোথায় যাবেন। ঠিক সেই সময় পৌল স্বপ্নে দেখলেন গ্রীস দেশ থেকে একজন লোক তাদের বলছে;
‘গ্রীস দেশে আসুন, আমাদের সাহায্য করুন।’
পৌল যখন ঘুম থেকে জেগে উঠলেন তখন নিশ্চিত ছিলেন যে, এই আহ্বান ঈশ্বরের কাছ থেকে এসেছে। তাই তারা সেখানে যাবার জন্য আজিয়ান সাগর পাড়ি দিতে লাগলেন।

ফিলিপী শহরের জেলখানায়

এর প্রায় এক সপ্তাহ পর, পৌল ও সাইলাসকে ধরে গ্রীকদের জেলখানায় রাখা হল। ফিলিপীয়রা তাদের বন্দি করেছিল এবং চাবুক মেরেছিল। (এটা তাদের আইনের বিরুদ্ধে ছিল কারণ পৌল কেবল যিহুদী নয় বরং তিনি একজন রোমীয় নাগরিক ছিলেন। সেই কথা অবশ্য তারা জানত না)।
জেলখানার ভিতরে মধ্যরাতে পৌল ও সাইলাস ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিলেন ও ঈশ্বরের প্রশংসা গান গাইছিলেন। তাদের পিঠে এত ব্যাথ্যা ছিল যে, তারা ঘুমাতে পারছিলেন না। আর হঠাৎ সেখানে ভূমিকম্প হল এবং জেলখানার দরজাগুলো খুলে গেল। তখন তাদের হাতের শিকলগুলো খুলে গেল।
সেখানকার প্রধান পাহারাদার ভাবল যে, বন্দিরা সব পালিয়ে গেছে। তাই সে আত্মহত্যা করতে গেল। কিন্তু পৌল চিৎকার করে বললেন যে, তারা পালিয়ে যান নি। তখন সেই প্রধান পাহারাদার যীশুর উপর বিশ্বাস স্থাপন করল। এরপর পৌল ও তার সংগীরা ফিলিপী শহর ছেড়ে অন্য জায়গায় গেলেন। এর মধ্যেই সেখানে একটি খ্রীষ্ট বিশ্বাসীদের দল গড়ে উঠল।
পৌল যোগাযোগ রাখার জন্য তাদের কাছে ও অন্যান্য খ্রীষ্ট বিশ্বাসীদের দলের কাছে চিঠি লিখতে শুরু করলেন। তার এইসব চিঠিতে তাদের প্রতিদিন জীবন যাপনের বিষয়ে ও যীশু খ্রীষ্টের বিষয়ে শিক্ষা দিতেন।

এথেন্স ও করিন্থ শহর

ফিলিপী শহর থেকে পৌল ও তার সংগীরা দক্ষিণ দিকে যাত্রা করলেন। পৌল যখন এথেন্স শহরে গিয়ে পৌঁছালেন তখন দেখতে পেলেন সেই শহর দেব দেবতাদের মূর্তিতে ভরা। এসব দেখে তিনি মনে খুব কষ্ট পেলেন। সেখানকার পার্থিনন মন্দিরটি ছিল খুব বড় ও সুন্দর। সেখানকার বাজারেও সুন্দর সুন্দর দালান ছিল। কিন্তু সেখানকার লোকেরা একমাত্র সত্য ঈশ্বর সম্পর্কে কিছু জানত না। তাই তিনি লোকদের কাছে সত্য ঈশ্বরের কথা, যীশু খ্রীষ্ট ও তাঁর মৃত্যু থেকে জীবিত হয়ে ওঠার কথা বলতে লাগলেন।
এথেন্সের লোকেরা ভাল করে তর্ক বিতর্ক করতে পারত। সেই শহরের মহাসভায় পৌলকে ডাকা হল যেন তারা তার নতুন শিক্ষার বিষয়ে শুনতে পারে। তারা সেখানে তাদের তর্ক-বিতর্ক পছন্দ করল বটে কিন্তু বেশী লোক যীশুর উপর বিশ্বাস করল না।
তাই পৌল সেখান থেকে অনেক বড় শহর করিন্থে গেলেন। তিনি সেখানে দু’জন বন্ধু পেলেন- তাদের নাম আকিলা ও অন্যজন তার স্ত্রী প্রিষ্কিল্লা। পৌল তাদের সঙ্গে থাকলেন ও তাদের সঙ্গে তার প্রতিদিনের খাবার সহ সব খরচ চালানোর জন্য তাঁবু সেলাই করতেন। প্রায় দেড় বছর ধরে পৌল ও সাইলাস করিন্থ শহরের লোকদের কাছে যীশুর বিষয়ে সুখবর প্রচার করলেন।

ইফিষ শহরে দাঙ্গা-হাঙ্গামা

তারা সকলে করিন্থ থেকে যাত্রা করলেন- আকিলা ও প্রিষ্কিল্লা ইফিষ শহরে যাবার জন্য এবং পৌল ও সীল আন্তিয়খিয়ায় যাবার জন্য। এর অনেক আগে পৌলও ইফিষে ছিলেন। তিনি সেখানে দু’বছর লোকদের যীশুর বিষয়ে শিক্ষা দিলেন।
ইফিষ শহর দীয়ানা দেবী ও তার মন্দিরের জন্য বিখ্যাত ছিল। সেখানকার স্বর্ণকারেরা ছিল খুব ধনী কারণ তারা দেবীর মূর্তি করে বিক্রি করত। কিন্তু পৌল ও সাইলাসের প্রচারের কারণে সেখানে অনেক লোক যীশু খ্রীষ্টের উপর বিশ্বাস করার ফলে স্বর্ণকারদের বিক্রি কমে গিয়েছিল।
দীমীত্রিয় নামে সেখানে একজন স্বর্ণকার ছিল। সে লোকদেরকে পৌল ও সাইলাসের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলল, ফলে সেখানে মারামারি শুরু হল। পৌল ও সাইলাসকে তারা টেনে-হিঁচড়ে বাইরে মাঠে নিয়ে গেল। সেখানে লোকেরা প্রায় এক ঘন্টা ধরে চেঁচামেচি ও চিৎকার করতে থাকল যতক্ষণ না শহরের মেয়র এসে তাদের থামাল।
শহরের অবস্থা যখন শান্ত হল তখন পৌল সেখানকার খ্রীষ্ট বিশ্বাসীদের একত্র করে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। পৌল প্রথমে গেলেন গ্রীসে তারপর সেখান থেকে যিরূশালেমে রওনা দিলেন।
তিনি জানতেন যে, সামনে তার অনেক বিপদ আছে। তাই যখন তার জাহাজ ইফিষের বন্দরে থামল তখন তিনি তার বন্ধুদের সাথে সেখানে দেখা করতে গেলেন। পৌল তাদের উৎসাহ দিলেন এবং তারা একসঙ্গে প্রার্থনা করলেন। তারপর কঁদাতে কাঁদতে তারা তার সঙ্গে জাহাজ পর্যন্ত এসে তাকে বিদায় জানাল।

প্রেরিত ১৩-২০

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য লিখতে এখানে ক্লিক করুন