শেষ ভোজ ও বিশ্বাসঘাতকতা

উদ্ধার-পর্বের দু’দিন আগে যীশুর বারোজন শিষ্যের একজন যিহূদা ইস্কারিয়োত মহাপুরোহিতের সঙ্গে দেখা করতে গেল। সে খুব রাগী ছিল ও হতাশায় ভুগছিল। সে চেয়েছিল যে যীশু অবশ্যই রোমীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য নেতৃত্ব দেবেন। কিন্তু তিনি তা করছেন না। তাই যিহূদা তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পরিকল্পনা করল।
যিহূদা পুরোহিতকে বলল, ‘যীশুর সঙ্গে যখন বেশি লোক থাকবে না তখন আমি তাঁর কাছে আপনাকে নিয়ে যাব।’ এই কাজের জন্য তারা যিহূদাকে তিরিশটি রুপার টাকা দিল।
উদ্ধার-পর্বের দিন সকালে যীশু তাঁর শিষ্যদের বললেন, ‘আমরা কোথায় আজ উদ্ধার-পর্বের ভোজ খেতে পারি?’ তখন ছিল ভোজের আয়োজনের সময়।
যীশু বললেন, ‘শহরে যাও। তোমরা একজন লোককে এক কলসী জল নিয়ে যেতে দেখবে। তোমরা তার পিছনে পিছনে যাবে। সে তোমাদের একটি ঘর দেখিয়ে দেবে। সেখানে উপরের একটি রুমে একসঙ্গে আমরা এই ভোজ খাব।’

একদিন সন্ধ্যাবেলা ভোজে বসবার আগে যীশু এক বালতি জল ও গামছা নিলেন। তাতে জল নিয়ে তার শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিলেন। চাকরেরা সাধারণত এই কাজ করে থাকে। এতে পিতর অবাক হয়ে গেলেন।
যীশু তাদের বুঝিয়ে বললেন, ‘যেমন আমি তোমাদের সেবা করলাম, তেমনি তোমরা একে অন্যের সেবা করবার জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকবে।’
যীশু জানতেন যে, তিনি আর বেশি সময় তাদের সঙ্গে থাকবেন না। তাঁর মরার সময় এসে গেছে। তাঁর শিষ্যেরা বুঝতে পারল যে, মারাত্মক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। যীশুর মুখখানাও যেন কালো দেখাচ্ছে।
তিনি শেষে বললেন, ‘তোমাদের মধ্য থেকেই একজন আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে যাচ্ছে। তারা সবাই এই কথা শুনে অবাক হলেন। বেশ কিছুক্ষণ কেউ কোন কথা বললেন না। তারপর যোহন, যে সবসময় তাঁর কাছে বসতেন, তিনি যীশুর কানের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ সে কে?’
উত্তরে যীশু বললেন, ‘আমি আঙ্গুর-রসে ডুবিয়ে যাকে এই রুটির টুকরাটা দিচ্ছি সে-ই।’
তিনি তা যিহূদা ইস্কারিয়োতকে দিলেন। যীশু তাকে বললেন, যাও, তোমার যা করার তা কর।’
এরপর যিহূদা রাতের অন্ধকারে সেখান থেকে বের হয়ে গেল।

সেই রাতে যীশু অনেক কথা বললেন এবং শিষ্যেরা তার কথা মনে গেঁথে রাখলেন। তিনি বললেন, তিনি তাদের কত ভালবাসেন- এত ভালবাসেন যে, তিনি তাদের জন্য জীবন দিয়ে দেবেন।
তিনি বললেন, ‘আমি তোমাদের ছেড়ে যাব না। ঈশ্বর তাঁর আত্মা তোমাদের জন্য পাঠাবেন। তিনি তোমাদের সঙ্গে থাকবেন ও সাহায্য করবেন। আমি তোমাদের জন্য জায়গা প্রস্তুত করতে ঈশ্বরের কাছে ফিরে যাচ্ছি। তারপর আমি ফিরে এসে তোমাদের আমার কাছে নিয়ে যাব যেন তোমরা আমার সঙ্গে থাকতে পার। তোমরা হতাশ হয়ো না ও ভয় পেয়ো না।
তারপর যীশু একটি রুটি নিলেন ও ঈশ্বরকে রুটির জন্য ধন্যবাদ দিয়ে তাদের খেতে দিলেন।
তিনি বললেন, ‘এটি আমার দেহ। আমাকে এই রুটির মতই ভাঙ্গা হবে- আমার মৃত্যু হবে। আমি তোমাদের জন্য মরতে যাচ্ছি। এরপর তিনি আঙ্গুর-রসের কাপ নিলেন ও ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন। তারপর তাদের পান করতে দিলেন।
তিনি বললেন, ‘এই হল আমার রক্ত, যা অনেক লোকের জন্য ঢালা হবে। আমার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ঈশ্বর ও তাঁর লোকদের মধ্যে নতুন নিয়ম তৈরী হবে।’
ভোজ শেষ হলে পর তারা সেই ঘর থেকে বের হয়ে হেঁটে গেৎশিমানী নামে একটি জলপাই বাগানে গেলেন।

বিশ্বাসঘাতকতা!

পথে যেতে যেতে কি ঘটতে যাচ্ছে সেই বিষয়ে যীশু তাঁর শিষ্যদের সাবধান করলেন।
তিনি বললেন, ‘আর কয়েক ঘন্টা পরেই তোমরা আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।’
পিতর বললেন, ‘আমি কখনও যাব না।’
কিন্তু যীশু বললেন, ‘ ভোরে মোরগ ডাকবার আগেই তুমি তিনবার বলবে যে, তুমি আমাকে চেন না।’
পিতর বললেন, ‘আমি আপনার সঙ্গে মরতেও রাজী।’ তারা সবাই একই কথা বললেন।
গেৎশিমানী বাগানে এসে যীশু পিতর, যোহন ও যাকোবকে তাঁর সঙ্গে নিয়ে একটু ভিতরের দিকে এগিয়ে গেলেন। অন্য শিষ্যেরা সেখানে বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
এই তিনজনকে যীশু বললেন, ‘আমার সঙ্গে এখানেই থাক আর জেগে থাক।’ তাঁর খুব মনোকষ্ট হতে লাগল। তারা একটি গাছের নিচে গেলেন এবং তাদের থেকে একটু দূরে গিয়ে যীশু হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করলেন।
তিনি বললেন, ‘পিতা, যদি সম্ভব হয় তবে আমাকে এই কঠিন মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা কর। কিন্তু যদি তোমার ইচ্ছা হয় তবেই মাত্র তা হোক। এভাবে তিনবার তিনি প্রার্থনা করলেন। প্রতিবারই প্রার্থনা শেষে তিনি পিতর, যোহন ও যাকোবের কাছে গিয়ে দেখলেন তারা ঘুমিয়ে পড়েছে।
তৃতীয়বার তিনি তাদের ঘুম থেকে জাগালেন। ইতিমধ্যে তারা লোকজনের আসার শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। লোকেরা হাতে মশাল নিয়ে তাদের দিকে আসছে। যিহূদা মন্দিরের পুরোহিত ও সৈন্যদের নিয়ে যীশুকে ধরতে এগিয়ে আসছে।

যিহূদা সৈন্যদের বলেছিল, ‘আমি যাকে চুমু দেব আপনারা তাকেই ধরবেন।’ তারপর যে যীশুর কছে গিয়ে তাঁকে চুমু দিল। তখন সৈন্যরা তাঁকে বন্দি করল।
যীশু তাদের বাধা দিতে বা নিজে পালাতে চেষ্টা করলেন না।
কিন্তু পিতর তার ছোরা খুলে প্রধান পুরোহিতের চাকর মল্কের ডান কান কেটে ফেললেন।
কিন্তু যীশু পিতরকে বললেন, ‘ তোমার ছোরা খাপেই রাখ। তিনি সেই লোকটির কান ছুঁয়ে তাকে সুস্থ করলেন।
এরপর তিনি প্রধান পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনারা ছোরা ও লাঠি নিয়ে ডাকাতের মত করে কেন আমাকে ধরতে এসেছেন?’
তারা কোন উত্তর দিল না। এরপর সৈন্যরা তাঁকে বেঁধে নিয়ে গেল।
তখন তাঁর সব শিষ্যেরা ভয়ে তাঁকে ছেড়ে পালিয়ে গেল।

মথি, মার্ক লূক ও যোহন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

নতুন লেখা

গাহি যীশুর জয়

১। গাহি যীশুর জয়, সবে যীশুর জয়- আনন্দে গাই সবে যীশুর জয়। ধূয়াঃ বল হাল্লেলুয়া, বল হাল্লেলুয়া - হাল্লেলুয়া,বল হাল্লেলুয়া। ২। দেখ ঈশ-নন্দন...

যখন প্রিয় যীশু দিলেন

যখন প্রিয় যীশু দিলেন প্রাণ, সাতটি কথা তখন বলে যান, প্রিয়জনের মরণ- কথা, ভাই, স্মরণ ক’রে কেমন দুঃখ পাই। ১। যখন লোকে তাঁর...

অপূর্ব প্রেমে প্রভু

অপূর্ব প্রেমে প্রভু এ জগৎ মাতালে, তুমি প্রেম-বলে,ধরাতলে বিজয়ী হইলে। ১। তুমি প্রেম ক’রে (যীশু হে, ও আমার দয়াল যীশু) তুমি প্রেম ক’রে...

ক্রুশ যাহার সুপরিচয়

ক্রুশ যাহার সুপরিচয় সত্য সাধন সার; প্রেমের যীশু ত্যাগের গুরু বন্ধু এ যাত্রার। ১। অঙ্গে যাহার রিক্ত পথিা চির দৈন্য বেশ- দীনের...

ধন্য পরম আরাধ্য যীশু

ধন্য পরম আরাধ্য যীশু , সত্য সনাতন, ঈশ্বর-নন্দন,পতিত-পাবন। ১ । সৃষ্টির পূর্বে ছিলে অনাদিকালে, বাক্য-ব্রহ্মরূপে পিতার কোলে; তুমি স্বয়ং ঈশ্বর,তুমি নিত্য পরাৎপর, তুমি নিখিল...

কত অপরুপ কার্য

কত অপরুপ কার্য, যীশু কৈলেন এ জগতে। স্ররষ্টা হয়ে সৃষ্টারুপে, অবতার নর- দেহেতে। ১। অন্ধ-খঞ্জ-নুলা যত, আর যত ভূতাশ্রিত, কুষ্ঠ রোগী কত...

আপনার ভাল লাগতে পারেএকই লেখা
আপনার জন্য লেখা