বাইবেলের গল্প

উত্তর-রাজ্যের আক্রমণ

রাজা যোয়াশের মৃত্যুর সত্তর বছর পরে তার ছেলের ছেলে হিষ্কিয় যিহূদা-রাজ্যের সিংহাসনে বলেন। হিষ্কিয়ের অনেক সমস্যা ছিল। যিহূদার উত্তর-পূর্ব দিকে আসিরিয়া রাজ্য ইতিমধ্যে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। আসিরিয়ার সৈন্যরা তাদের দেশের শহরগুলো ধ্বংস করে দিত, লোকদের অত্যাচার করত ও তাদের মেরে ফেলত। তাদের এই নিষ্ঠুর আচরণের জন্য সবাই তাদের ভয়ে ভয়ে থাকত।

ধীরে ধীরে তারা তাদের চারপাশের ছোট ছোট রাজ্যগুলো দখল করে বিশাল আসিরিয়া সা¤্রাজ্য গড়ে তুলেছিল।
হিষ্কিয়ের রাজত্বের চার বছরের মাথায় আসিরীয়রা ইস্রায়েল রাজ্য আক্রমণ করে। তারা তিন বছর ধরে ইস্রায়েল রাজ্যের রাজধানী শমরিয়া ঘেরাও করে রাখে। শহর পতনের আগে সেখানে অনেক লোক না খেয়েই মারা গেল।
আসিরীয়রা ইস্রায়েলের রাজাকে বন্দি করে নিয়ে গেল। তারা জোর করে ইস্রায়েলীয়দের তাদের দেশ থেকে ধরে বহু দূরের একটি দেশে নিয়ে গেল। তারা আর কোনদিন তাদের নিজেদের দেশে ফিরে আসতে পারে নি।

ভিন্ন দেশের লোকদেরকে শমরিয়ায় নিয়ে এসে সেখানে বাস করতে দেয়া হল। সেসব লোকেরা তাদের সঙ্গে তাদের দেশের দেব-দেবতার মূর্তিও নিয়ে আসল।
সেখানে অনেক খারাপ ও ভয়ানক সব ঘটনা ঘটতে থাকল। এসবের কারণ ছিল ইস্রায়েলীয়রা ঈশ্বরের কথা শুনতে ও তাঁর বাধ্য থাকতে অস্বীকার করেছিল। ঈশ্বর বার বার তাদের সাবধান করেছিলেন কিন্তু তারা তা শোনে নি।

যিহূদা রাজ্যের অবস্থাও খুব ভাল ছিল না। লোকেরা কাঠ ও পাথরের তৈরী মূর্তির পূজা করত। ঈশ্বরকে তারা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।
কিন্তু যিহূদার লোকেরা ছিল ভাগ্যবান কারণ তারা হিষ্কিয়ের মত রাজা পেয়েছিল। হিষ্কিয় একজন ভাল লোক ছিলেন, তিনি ঈশ্বরের উপর নির্ভর করতেন। তিনি সমস্ত মূর্তি ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
তিনি বললেন, ‘আমি চাই আমার লোকেরা যেন ঈশ্বরের উপরে নির্ভর করে।’

যিহূদার লোকেরা আরেকটি কারণে ভাগ্যবান ছিল, কারণ যিশাইয় ছিলেন তখন তাদের নবী। ঈশ্বরের মনে কি আছে তা যিশাইয় তাদের বলতেন।
তিনি বলতেন, ‘আপনারা ইস্রায়েলের লোকদের মত হবেন না। আপনারা দেখেছেন কোথায় তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ঈশ্বরকে ভালবাসুন ও তাঁকে মান্য করুন। আসিরীয়রা আসছে, কিন্তু আপনারা ভয় পাবেন না। ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে আছেন।’

মাত্র সাত বছর পরই আসিরীয়রা সেই দেশে আসে। তারা যিহূদার দক্ষিণ সীমানা ধরে তারা আবার আগাতে থাকে এবং পরে তারা মহান শহর যিরূশালেমের গেটে এসে উপস্থিত হয়। রাজা হিষ্কিয় ও যিশাইয় এবং সমস্ত লোক শহরের ভিতরে খাঁচার পাখীর মতই যেন আটকা পড়ে যায়।

আসিরিয়ার তিনজন সেনাপতি শহরের প্রধান গেটে এসে চিৎকার করে রাজাকে ডাকাডাকি করতে থাকে। এতে রাজা হিষ্কিয়ের তিনজন মন্ত্রী বের হয়ে তাদের কাছে যায়। শহরের লোকেরা শহরের দেয়ালের উপর দাঁড়িয়ে তাদের কথাবার্তা শুনতে থাকে। তাদের চোখ যায় চক্চকে তলোয়ার ও বর্শার দিকে, আর দেখতে পায় আসিরিয়ার সৈন্যরা ঢাল, তলোয়ার ও বর্শা জমা করে রেখেছে।

আসিরীয় সৈন্যরা বলল, ‘এসব কথা আসিরিয়ার রাজা সনহেরীবের। আপনারা যদি পারেন তবে শান্তি স্থাপন করুন। আপনারা এখন আমাদের অধীনে। আপনারা কি মনে করেন আপনাদের ঈশ্বর আপনাদের রক্ষা করবেন? আপনাদের চারপাশের জাতিদের কি তাদের দেবতারা আমাদের রাজার হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছে? শমরীয়দের কি কেউ রক্ষা করেছে? আপনাদের রাজা যেন না বুঝায় যে, ঈশ্বর আপনাদের রক্ষা করবেন। আপনারা বের হয়ে এসে আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করুন!’
কিন্তু লোকেরা কোন উত্তর দিলেন না।

রাজা হিষ্কিয় সাহায্যের জন্য কয়েকজন লোককে নবী যিশাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। নবী তাদের সব কথা শুনলেন।
নবী উত্তরে বললেন, ‘রাজা হিষ্কিয় যেন ভয় না করেন। ঈশ্বরই শহরটি রক্ষা করতে পারেন এবং তিনি তা করবেন।’
আসিরিয়ার রাজা সনহেরীব হিষ্কিয়ের কাছে এই বলে একটি চিঠি লিখলেন।

চিঠিতে তিনি বললেন, ‘আমি শহরটি ধ্বংস করে ফেলব। আপনার ঈশ্বর আপনাকে কোন মতেই উদ্ধার করতে পারবে না।’
হিষ্কিয় সেই চিঠিটি মন্দিরে নিয়ে গেলেন এবং ঈশ্বরের কাছে সেই বিষয়ে প্রার্থনা করলেন।
তিনি বললেন, ‘হে সদাপ্রভু তুমি একমাত্র ঈশ্বর। তুমি এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছ। তুমি সমস্ত রাজাদের রাজা। দয়া করে আসিরীয়দের হাত থেকে আমাদের রক্ষা কর।’

এদিকে নবী যিশাইয় রাজারা কাছে এই খবর পাঠালেনঃ
‘ঈশ্বর আসিরিয়ার রাজার তিরস্কার শুনেছেন। ঈশ্বর বলেছেন, “আমি তাকে ক্ষমতা দিয়েছি, কিন্তু আমি এখন তাকে বন্দিদশায় নিয়ে যাব। সে এই শহরে প্রবেশ করবে না। তার সৈন্যরা এই শহরের দিকে কোন তীর বা ধনুক ছুঁড়বে না। আমি যিরূশালেমকে রক্ষা করব।” ’

সেই রাতে আসিরীয়দের ছাউনিতে একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটল। হাজার হাজার আসিরীয় সৈন্য মারা গেল। কেউ জানল না কেন এমন হল। পরের দিন সকালে সারা ছাউনিতেই শুধু লাশ আর লাশ।
এছাড়া, আসিরিয়ার রাজা শুনতে পেলেন যে, অন্য এক রাজ্য তার নিজের দেশকে আক্রমণ করেছে। এই কথা শুনে তিনি তার রাজধানী নীনবীতে ফিরে গেলেন। এর কয়েকদিন পরেই তার দুই ছেলে তাকে খুন করল।
যিরূশালেমে আবার শান্তি ফিরে এল।

যিশাইয় ভবিষৎ দেখতে পেলেন

হিষ্কিয় যখন বুড়ো হয়ে গেলেন তখন বাবিলের রাজার কাছ থেকে কয়েকজন লোক তার কাছে এল। হিষ্কিয় তাদের সঙ্গে বন্ধুর মত ব্যবহার করলেন এবং অহংকারের সাথেই তার সমস্ত ধন-সম্পদ তাদের দেখালেন।
তখন নবী যিশাইয় রাজাকে বলল, ‘বাবিলীয়রা এখন আমাদের বন্ধু, কিন্তু ঈশ্বর বলেছেন এমন একদিন আসবে যখন আপনার সমস্ত ধন-সম্পদ ও আপনার অনেক লোককে বাবিলে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হবে।’
লোকদের জীবনে যা ঘটতে যাচ্ছে সেই বিষয়ে ঈশ্বর যিশাইয় নবীর মাধ্যমে কথা বলেছেন।
যিশাইয় লোকদের বললেন, ‘ঈশ্বর আসিরীয়দের হাত থেকে যিরূশালেমকে রক্ষা করেছেন। কিন্তু যদি আপনারা তাঁর উপর সত্যিই নির্ভর না করেন, তাঁর আইন-কানুন পালন না করেন তবে একদিন আসবে যখন যিরূশালেমের পতন হবে। শত্রুরা এসে আপনাদের বন্দি করে দূরে এক দেশে নিয়ে যাবে। অবশ্য ঈশ্বর আপনাদের ভুলে যাবেন না। তিনি আবার আপনাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে আনবেন।’
নবীর চোখ হঠাৎ করে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

তিনি জানেন কিছু কিছু আশ্চর্য বিষয় ঘটবে বলে ঈশ্বর পরিকল্পনা করে রেখেছেন, তা এখন ঘটবে না। এমনকি খুব তাড়াতাড়িও ঘটবে না। ঘটবে ভবিষ্যতে। একদিন ঈশ্বর তাঁর নিজের রাজাকে পাঠিয়ে দেবেন।
‘ঈশ্বর একটি বালককে পাঠাবেন। তিনি আমাদের শাসনকর্তা হবেন।
তাঁকে বলা হবে আশ্চর্য মন্ত্রী, বিক্রমশালী ঈশ্বর, সনাতন পিতা, শান্তিরাজ…
তিনি রাজা দায়ূদের সিংহাসনে বসবেন।’

যিশাইয় বলেছেন, ‘সেই রাজার জন্য আমাদের অবশ্যই পথ প্রস্তুত করতে হবে। মরুভূমিতে তাঁর পথ প্রস্তুত করতে হবে,
সকল উপত্যকা ভরতে হবে।
সকল পাহাড় সমান করতে হবে,
যেন সব জায়গার লোক ঈশ্বরের মহিমা দেখতে পায়।’
যিশাইয় যা বলেছিলেন তা সবই ঘটেছিল কিন্তু তখনই নয়। অনেক বছর পরে।

২ রাজাবলি ১৮-২০; যিশাইয়

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য লিখতে এখানে ক্লিক করুন

ক্রাইষ্টবিডি রেডিও