বাইবেলের গল্প

রাজা দায়ূদ দীর্ঘজীবী হোক!

শিংগা বাজান হল। লোকেরা খুব জোরে জোরে আনন্দে চিৎকার করল। দায়ূদকে ইস্রায়েলের রাজ মুকুট পরানো হল। লোকেরা চিৎকার করে বলল, ‘রাজা দায়ূদ দীর্ঘজীবী হোক! রাজা দায়ূদ দীর্ঘজীবী হোক!!’
তারা পালিয়ে বেড়াবার জীবন শেষ হল। কিন্তু এতে দায়ূদের সব সমস্যার শেষ হয়ে গেল না। রাজা শৌলের দলের লোকেরা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করল। তাদের পুরানো শত্রু পলেষ্টীয়রা আবার তাদের দেশ আক্রমণ করতে চাইল। তাদের রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু যে যিরূশালেম তা তখনও কনানীয়দের একটি গোষ্টির ছিল।

যেদিন রাজা দায়ূদ কনানীয়দের শক্ত ঘাটি যিরূশালেম দখন করে নিয়ে সেটি তার রাজধানী বানালেন, সেই দিনটা সত্যিই খুব আনন্দের দিন ছিল।
অবশেষে সেখানে শান্তি ফিরে আসল। দায়ূদ অনেক দিন ধরে যা করতে চেয়েছিলেন এখন তিনি তা করতে পারেন। যে নিয়ম-সিন্দুকের মধ্যে ঈশ্বরের আইন- কানুন ছিল সেই বিশেষ বাক্সটি তিনি যিরূশালেমে নিয়ে আসার জন্য তার লোকদের আদশে দিলেন।

দিনটি ছিল খুবই আনন্দের- নাচ, গান ও উৎসবের দিন। সেদিন দায়ূদও আনন্দে অনেক নাচলেন। যিরূশালেম একটি রাজধানীর চেয়েও অনেক বড়। এটি হল ঈশ্বরের শহর।
রাজা দায়ূদ দেখতে খুবই সুন্দর ছিলেন। তিনি একজন বিখ্যাত যোদ্ধা ও লম্বা চওড়া পুরুষ ছিলেন, যিনি জন্ম থেকেই যেন একজন নেতা। সবাই তাকে ভালবাসত। তিনি রাজা শৌলের মত অহংকারী ও অবাধ্য ছিলেন না। ঈশ্বরের প্রতি ছিল তার অগাধ ভালবাসা। কিন্তু তার জীবনে একটি সময় এসেছিল যখন তিনি একটি মস্ত বড় অন্যায় করে ফেলেছিলেন।

একজন গরীব লোকের ভেড়া

বসন্তকালের এক বিকেলে যখন তার সৈন্যরা অম্মোন দেশের রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে তখন রাজা দায়ূদ তার রাজপ্রাসাদের ছাদে গেলেন ঠান্ঠা বাতাসে আরাম করার জন্য। ছাদ থেকে নীচে তাকাতেই তিনি খুবই সুন্দরী একজন মহিলাকে দেখতে পেলেন!
তিনি একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে এই সুন্দরী মহিলা?’
উত্তর এল, ‘বৎশেবা, ঊড়িয়ের স্ত্রী।’
ঊড়িয় ছিল দায়ূদের সবচেয়ে সাহসী যোদ্ধা, আর এখন সে রাজার জন্য যুদ্ধ করতে অনেক দূরে আছে। দায়ূদ বৎশেবাকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে আসতে তার লোকদের আদেশ করলেন। এরপর রাজা বৎশেবাকে নিয়ে তার বিছানায় গেলেন।

এর কয়েক সপ্তাহ পরে, বৎশেবা রাজারা কাছে চিঠি পাঠিয়ে বলল, তিনি দায়ূদের সন্তানের মা হতে চলেছেন। তার স্বামী যখন তা জানতে পারবে তখন কি হবে? দায়ূদ তাই তাড়াতাড়ি একটা কুপরিকল্পনা করলেন। তিনি তার সেনাপতিকে এই আদেশ দিলেনঃ
‘ঊড়িয়কে যুদ্ধের প্রথম সারিতে পাঠান এবং নিশ্চিত হোন যেন সে যুদ্ধে মারা যায়।’
এসবই তিনি করলেন গোপনে। দায়ূদ ভেবেছিলেন কেউ তা জানতে পারবেন না। তিনি ঈশ্বরের কথা একরকম ভুলেই গিয়েছিলেন। কিন্তু এদিকে ঈশ্বর সবকিছু দেখে রাখলেন।
ঊড়িয় যুদ্ধে মারা গেল।

দায়ূদ বৎশেবাকে বিয়ে করলেন।
কয়েক মাস পরে তাদের ঘরে একটি ছেলে হল। দায়ূদ মনে করেছিলেন যে, সেই গোপন কথা কেউ জানাবে না।
একদিন নাথন নামে ঈশ্বরের একজন নবী একটি গল্প নিয়ে রাজার কাছে এলেন। তিনি বলতে লাগলেন,
‘এক গ্রামে দু’জন লোক বাস করত, একজন খুব ধনী ও অন্যজন খুব গরীব। সেই ধনী লোকের অনেক গরু ও ভেড়ার পাল ছিল। কিন্তু সেই গরীব লোকের মাত্র একটি ভেড়া ছিল- সেটা তার কাছে তার সন্তানের মতই প্রিয় ছিল।

সেই ধনী লোকের বাড়ীতে একজন অতিথি এলে খাবার জন্য একটি ভেড়ার দরকার হল। কিন্তু সে তার ভেড়ার পাল থেকে একটি নিয়ে জবাই না করে বরং সেই গরীব লোকের ভেড়াটি নিয়ে জবাই করল। তারপর তা রান্না করে তার অতিথিকে খেতে দিল।’
এই গল্প শুনে রাজা দায়ূদ সেই ধনী লোকের উপর প্রচন্ড রেগে গেলেন। তিনি বললেন, ‘কেমন করে একজন মানুষ এত নিষ্ঠুর হতে পারে?’ মুহুর্তেই সেখানে এক গভীর নীরবতা নেমে এল।
তখন নাথন বললেন, ‘রাজা মহাশয়, আপনিই সেই লোক! ঈশ্বর আপনাকে রাজা বানিয়েছেন এবং আপনি যা চেয়েছেন তা-ই তিনি আপনাকে দিয়েছেন। এর পরেও আপনি ঊড়িয়ের স্ত্রীকে নিয়ে নিয়েছেন এবং ঊড়িয়কে যুদ্ধে পাঠিয়ে মেরে ফেলেছেন। ঈশ্বর এ সবই দেখেছেন। আপনি রাজা বলে ভাববেন না যে, আপনি যা ইচ্ছা তা করতে পারেন। আপনার পাপের কারণে আপনার ছেলেটি অবশ্যই মারা যাবে।’
দায়ূদ খুবই ভয় পেলেন এবং তিনি যে অন্যায় করেছেন তার জন্য খুবই দুঃখিত হলেন। কিন্তু তিনি সেই ছেলেটিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলেন না। ছেলেটি মারা গেল।
দায়ূদ বৎশেবাকে সান্ত¡না দিলেন এবং ঈশ্বরও তাকে ক্ষমা করলেন। তিনি তাদেরকে আরেকটি ছেলে দিলেন। তার নাম রাখা হল শলোমন।

এরপরের বছরগুলোতে রাজা কাজে খুবই ব্যস্ত ছিলেন। তিনি অনেক যুদ্ধ করেছেন ফলে তার রাজ্য খুবই শক্তিশালী হল। কিন্তু তিনি আগ্রহের সাথে একটি বিশেষ কাজ অর্থাৎ একটি মন্দির ঈশ্বরের জন্য তৈরি করতে চাইলেন। তবে তিনি তা করতে পারলেন না। ঈশ্বর বললেন, ‘সেই মন্দির শলোমন তৈরী করবে।’
তাই রাজা দায়ূদ সেই মন্দিরের নকশা এবং জিনিসপত্র যা যা লাগবে সব যোগাড় করে রাখলেন। সোনা, রুপা, ব্রোঞ্জ, লোহা, কাঠ ও দামী পাথর যোগাড় করে রাখলেন, যাতে শলোমন সহজেই মন্দির তৈরীর কাজ শুরু করতে পারে। এছাড়া মন্দিরে উপাসনা-সভার প্রস্তুতির জন্য, বিশেষ করে বাদ্যযন্ত্রের জন্য তিনি অনেক সময় ব্যয় করলেন। রাজা গান বাজনা খুবই ভালবাসতেন এবং তিনি অনেক সুন্দর সুন্দও গান রচনা করলেন।*

বিদ্রোহ

হ্যাঁ, দায়ূদ অবশ্যই একজন মহান রাজা ছিলেন- অনেক রাজার মধ্যে তিনিই বিশেষ রাজা ছিলেন। কিন্তু তার পরিবারের মধ্যেই ছিল একটি ভিন্ন ঘটনা। তিনি যদিও দেশের কাজ ঠিকভাবে করতেন কিন্তু তিনি তার ছেলেদেরকে ভালভাবে মানুষ করেন নি। তার তার এই দুর্বলতার জন্য তাকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে এবং কষ্ট পেতে হেয়েছে।
*দায়ূদের অনেক গান বাইবেলের গীতসংহিতা বইটিতে পাওয়া যায়।
রাজার সুন্দর যুবক ছেলে অবশালোমকে সবাই ভালবাসত। কিন্তু এই ভালবাসা তার কাছে যথেষ্ট ছিল না। সে ভেবে রেখেছিল যে, সে রাজা হবে। সে তার বাবার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে হিব্রোণ শহরে একটি জনসভার আয়োজন করল। সেখানে সে নিজেকে রাজা বলে ঘোষণা দিল। এরপর সে রাজধানী যিরূশালেমের দিকে আগাতে থাকল। এতে রাজা নিজের প্রাণ বাঁচাবার জন্য সেখান থেকে পালিয়ে গেলেন।
এটা ছিল একটি গৃহযুদ্ধ।
সবচেয়ে জ্ঞনী মন্ত্রী অহীথোফল অবশালোমের সংগে যোগ দিয়ে রাজার বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু ঈশ্বর রাজাকে ভুলে যান নি। তিনি দায়ূদকে ভালবাসতেন এবং সারা জীবন তার দেখাশুনা করেছেন। তখনও তিনি তার যত্ন নিচ্ছিলেন।

হূশয় ছিলেন দায়ূদের একজন বিশ্বস্ত বন্ধু। তিনি অবশালোমের পক্ষে আছেন এমন ভান করলেন। আসলে তিনি অবশালোমের গোপন পরিকল্পনা রাজাকে জানিয়ে দেবার জন্য এমনটি করেছিলেন।
অহীথোফল দায়ূদের পিছনে তাড়া করার জন্য অবশালোমকে উপদেশ দিলেন। আর এদিকে হূশয় তাকে অপেক্ষো করতে বললেন। এই সুযোগে রাজা যুদ্ধের জন্য সৈন্য বাহিনী প্রস্তুত করার সময় পান।
এরপর বাবা ও ছেলের মাঝে এক ভীষণ যুদ্ধ হয় এবং এতে দায়ূদের সৈন্যরা জয় লাভ করে। অবশালোম তাড়াতাড়ি পালাতে গিয়ে গাছের ডালের সঙ্গে তার চুল আটকে গিয়ে সেখানেই সে ঝুলে থাকে। দায়ূদের সৈন্যরা তাকে সেখানে ধরে ফেলে। যদিও রাজার আদেশ ছিল অবশালোমের জীবন রক্ষা করার কিন্তু সৈন্যরা তাকে সেখানে মেরে ফেলে।
এই খবর শুনে রাজা দায়ূদ কষ্টে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন, আর ‘হে আমার ছেলে অবশালোম, তুমি আর নেই; আমি যদি তোমার জায়গায় মরতে পারতাম’ এই বলে কঁদতে থাকেন।
তাই বিজয়ের সেই দিনটি একটি শোকের দিনে পরিণত হয়।
যিরূশালেমে ফিরে এসে যারা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল দায়ূদ তাদের শাস্তি দেন। এরপর তার সিংহাসনের আর কোন হুমকি রইল না। কিন্তু অবশালোমের বিদ্রোহ ও মৃত্যুও পর রাজা নিজেকে ভীষণ ক্লান্ত ও দূর্বল অনুভব করেন। এতে ইস্রায়েলের লোকেরা একে অন্যকে জিজ্ঞেস করতে থাকে দায়ূদের কোন্ ছেলে এরপর রাজা হবে।

২ শমূয়েল

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য লিখতে এখানে ক্লিক করুন