বাইবেলের গল্প

নবী যিরমিয় ও যিরূশালেমের পতন

যিরমিয়কে ঈশ্বর যখন নবী হিসাবে আহ্বান করেন তখনও যোশিয় যিহূদার রাজা ছিলেন। যিরমিয় তখন ছিলেন যুবক এবং খুবই লাজুক। লোকদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রচার করবার মত তিনি সাহসী ছিলেন না।
ঈশ্বর বললেন, ‘আমি তোমার জন্মের আগেই তোমাকে বেছে নিয়েছি। তুমি ভয় করবে না। তোমার চেয়েও আমি তোমাকে আরও ভাল জানি। কি বলতে হবে তা আমিই তোমাকে বলে দেব। আমিই তোমাকে নিরাপদে রাখব।’

আসলে যিরমিয়ের করার কিছু ছিল না। কারণ ঈশ্বরের বাক্য ছিল আগুনের মত। যদি তিনি সেই কথা না বলে নিজের মধ্যে রেখে দিতেন, তবে তা যেন তার অন্তর পুড়িয়ে দিত। তাই সব সময় তাকে ঈশ্বরের কথা বলতেই হত।
যিরমিয় খুব খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। দক্ষিণের ও উত্তরের বড় বড় দু’টি রাজ্যের মাঝখানে ছিল ছোট্ট যিহূদা দেশ। মিশর যখন যিহূদা দেশের মধ্য দিয়ে বাবিলীয়দের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাচ্ছিল তখন রাজা যোশিয় বাবিলীয়দের পক্ষে মিশর রাজাকে বাধা দিতে গিয়ে যুদ্ধে নিজেই মারা পড়েন।
এর চার বছর পর, বাবিলের রাজা নবূখদ্নিৎসর যুদ্ধে জয় লাভ করেন। তিনি মিসরকে পরাজিত করেন এবং যিহূদাকে নিজের অধীনে নিয়ে আসেন।
এই সময়ে যিরমিয় বিশ্বস্থভাবে লোকদের কাছে ঈশ্বরের বাক্য বলে বেড়াতেন; কি করতে হবে তা তাদের জানাতেন। তিনি তাদের বলতেন যদি তারা ঈশ্বরের পথে ফিরে না আসে তাহলে এক ভয়ংকর বিপদের মধ্যে তাদেরকে পড়তে হবে।

কিন্তু এ কথায় লোকেরা তেমন সাড়া দেয় নি। তারা আগের মতই মূর্তি পূজায় মেতে থাকল। কেউ যিরমিয়ের কথায় গুরুত্ব দেয় নি। তারা ভাবত যে, তিনি তাদের সঙ্গে তামাশা করছেন। ধ্বংসের যেসব কথাবার্তা তিনি বলতেন তাতে হয়ত তার মাথা খারাপ হয়েছে বলে লোকেরা মনে করত। ঈশ্বরের কথা শুনতে তাদের কান বধির হয়ে গিয়েছিল এবং ভবিষ্যতে কি হবে তা তারা বুঝতে পারত না।
যিরমিয় নানারকম ছবি বা জিনিষ ব্যবহার করে কথা বলতেন যাতে লোকেরা তার কথা ভালভাবে বুঝতে পারে। তিনি এক কুমারের বাড়ীতে গিয়ে দেখলেন যে, কুমার তার কাজ করছে। কুমারের চাকা যখন ঘোরে তখন কুমার পাত্রের কাঠামো ঠিক করে। তাতে একটুকরা কাদা মাটি আস্তে আস্তে একটি জগ বা ছাড়িতে রূপ নেয়। কোন কোন সময় আবার ভুল হয়ে যায়। তখন কুমার সেই মাটি ভেঙ্গে আবার চাকায় দিয়ে নতুন পাত্র তৈরী করে। ঈশ্বর যিরমিয়কে বললেন, ‘ইস্রায়েলীয়রা আমার হাতে আছে, ঠিক যেমন কুমারের হাতে মাটি থাকে।
তাদের ধ্বংস করে আবার ঠিকভাবে তৈরী করার অধিকার আমার আছে- এবং আমি তা-ই করব যদি তারা আমার কথা না শোনে। তাদের অবশ্যই নিজেদের পথ পরিবর্তন করতে এবং অন্যায় করা থেকে ফিরে আসতে হবে।’

যিরমিয় এসব কথা লোকদের বললেন- কিন্ত তারা তার কথা শুনতে চাইল না।
অন্য একদিন যিরমিয় মন্দিরের সামনে দাড়িয়ে বলছিলেন, ‘এই কথা ঈশ্বর বলেছেন; “যদি তোমরা আমার কথা না শোন ও আমার আইন-কানুন পালন না কর তবে আমি এই মন্দির ও এই যিরূশালেম ধ্বংস করে দেব”।’

এই কথা পুরোহিতদের কাছে খুব খারাপ লাগল। এরপর থেকে তারা যিরমিয়কে মন্দিরের সামনে আসতে দিত না। তাকে বন্দি করে তারা লাঠি দিয়ে মারল। কিন্তু ঈশ্বরের বাক্য কেউ বাধা দিয়ে রাখতে পারে না। যিরমিয়কে বন্দি করে রাখা হয়েছিল বলে তিনি ঈশ্বরের বাক্য লোকদের বলতে পারতেন না, কিন্তু তিনি লিখতে পারতেন।
ঈশ্বর তাকে যেসব কথা বলতন তিনি সেসব কথা তার গুটানো (ক্যালেন্ডারের মত দেখতে) বইতে লিখে রাখতেন। এটা রাজার সামনে পড়া হল। এসব শুনে রাজা রেগে গিয়ে সেই গুটানো বই আগুনে পুড়িয়ে দিলেন।
কিন্তু তাতে কোন কাজ হল না। যিরমিয় আবার সেসব কথা অন্য একটি গুটিয়ে রাখা বইতে লিখলেন।
যিরমিয় লিখলেন, ‘ হে রাজা, ঈশ্বরের বাক্য আগুনে মত। আপনি তা আপনার ভিতরে পুষে রাখতে পারবেন না। এটি হাতুরির মত, যা সবচেয়ে কঠিন পাথরকেও টুকরা টুকরা করে ভেঙ্গে দিতে পারে।’

এদিকে যিহূদার রাজা নবূখদ্নিৎসর রাজাকে র্ক দেওয়া বন্ধ করে দিলেন এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নিজের সিংহাসন হারালেন।
নবূখদ্নিৎসরের সৈন্যরা যিরূশালেমে এসে যিহুদার রাজাকে ধরে বাবিলে নিয়ে গেল- সঙ্গে নিয়ে গেল আরও হাজার হাজার লোক। (এদের সঙ্গে এক যুবক ছিল যার নাম যিহিষ্কেল।)*
এরপর সিদিকিয়কে যিহূদার রাজা করা হল। তিনিই ছিলেন যিহূদার শেষ রাজা। কিন্তু তখনও লোকেরা ঈশ্বর থেকে কোন শিক্ষা গ্রহণ করে নি।
যিরমিয় ঘোষণা দিলেন, ‘ঈশ্বর বলেছেন, তোমরা বাবিলীয়দের হাতে ধরা দাও, নইলে তারা তোমাদের ধ্বংস করে দেবে। মূর্তিপূজা ছেড়ে দাও। দেরী হয়ে যাবার আগেই তোমরা জীবন্ত ঈশ্বরের কাছে ফিরে এসো। সময় বেশী নেই।’

কঠিন কঠিন কথা বলার জন্য যিরমিয়কে যিরূশালেমের কেউ ভালবাসত না।
লোকেরা বলত, ‘প্রতারক, আপনি একজন প্রতারক। আপনি আমাদের শত্রুর কাছ থেকে ঘুস খান ও আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলেন।’

কয়েক বছর আগে যিহিষ্কেলকে বন্দি করে নিয়ে আসা হয়েছে।

সিদিকিয় দশ বছর ধরে রাজত্ব করার পর তিনিও বিদ্রোহ করলেন। নবূখদ্নিসর আবারও যিরূশালেমে এসে তা ঘেরাও করে রাখলেন।
যিরমিয় আবারও লোকদের বললেন, ‘যদি আপনারা জীবন বাঁচাতে চান তবে শত্রুদের কাছে আত্মসমর্পণ করুন। ঈশ্বর এই শহরকে বাবিলীয়দের হাতে দিযে দিয়েছেন।’
এ কথায় নেতারা ভীষণ রেগে গেল। তারা যিরমিয়কে একটি গভীর কুয়ার মধ্যে ফেলে দিল। অবশ্য সেখানে কোন জল ছিল না- ছিল শুধু কাদা। তারা সেখানে তাকে ফেলে দিল যাতে সেখানে তিনি মারা যান। কিন্তু এবদমেলক নামে একজন ইথিওপিয়া দেশের লোক রাজবাড়ীতে কাজ করত। সে রাজার কাছে গিয়ে যিরমিয়ের জীবন বাঁচাতে অনুরোধ করল। তারপর সে আরও তিনজন লোক নিয়ে গিয়ে দড়ির সাহায্যে যিরমিয়কে সেখান থেকে নিরাপদে তুলে আনল।

এরপর রাজা গোপনে যিরমিয়ের সঙ্গে কথা বললেন।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি এখন কি করব।’
‘যিরমিয় বললেন, ‘আত্মসমর্পণ করুন। এই শহরকে ধ্বংস করা হবে।’
যিরমিয় যা বললেন রাজা তা না করে তিনি তার নিজের জীবন বাঁচাবার জন্য পালাতে চেষ্টা করলেন।

কিন্তু বাবিলীয়রা তাকে ধরে ফেলল এবং তার দু’চোখ তুলে নিল এবং তারা তার দুই ছেলেকে মেরে ফেলল।
তারা শহরের দেয়াল ধ্বংস ও রাজবাড়ী ভেঙ্গে গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলল এবং ঈশ্বরের মন্দির ও বাড়ী-ঘর আগুনে পুড়িয়ে দিল। তারা মন্দিরের সব ধন-সম্পদ লুট পাট করে নিয়ে গেল।
তারা তাদের সঙ্গে সব লোকদের অনেক দূরের দেশ বাবিলে চাকর হিসাবে কাজ করবার জন্য নিয়ে গেল- যে দেশ থেকে শত শত বছর আগে অব্রাহামকে ঈশ্বর বের করে এনেছিলেন এই ছিল সেই দেশ।
মাত্র কয়েকজন লোক দেশে রয়ে গেল যিরমিয় তাদের সঙ্গে রইলেন। তিনি যে সাবধান বাণী বলেছিলেন তা কেউ শোনে নি। তাই ঈশ্বর এই অবাধ্য লোকদের শাস্তি দিলেন। কিন্তু তিনি তাদেরকে ভালবাসা বন্ধ করেন নি।

যারা বন্দি হয়ে বাবিলে গিয়েছে যিরমিয় তাদের কাছে সান্ত¡নার চিঠি লিখলেন:
‘ঈশ্বর বলেছেন, “আমি প্রতিজ্ঞা করেছি যে, একদিন আমি তোমাদেরকে আবার তোমাদের দেশে ফিরিয়ে আনব। তোমরা বন্দি অবস্থায় আমাকে ভালবাসতে শিখবে। তোমরা আমার আইন-কানুন স্মরণ করবে এবং যা ঠিক তা পালন করতে শুরু করবে। সেই দিনের অপেক্ষায় থাক যখন আমি তোমাদের বন্দি অবস্থা থেকে আবার নিজের দেশে ফিরিয়ে আনব।’ ”

যিরমিয় ১-৫২

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য লিখতে এখানে ক্লিক করুন

ক্রাইষ্টবিডি রেডিও