বাইবেলের গল্প

ইলিশায়ের কাহিনী

ইতিমধ্যে এলিয় খুব বুড়ো হয়ে গেছেন। সময় এসেছে ঈশ্বরের কাছে চলে যাবার। তিনি যেখানেই যেতেন ইলিশায়ও সব সময় তার সঙ্গে সঙ্গে থাকতেন।
একদল শিষ্য-নবী জেরিকো থেকে এলিয় ও ইলিশায়ের পিছনে পিছনে তাদের অনুসরণ করতে লাগল এবং তারা যখন জর্ডান নদীর তীরে তখনও তাদের উপর শিষ্য-নবীরা নজর রাখছিল। হঠাৎ এলিয় তার গায়ের চাদও দিয়ে জলের উপর আঘাত করলেন এবং জলের মধ্য দিয়ে তদের জন্য একটি পথ হয়ে গেল আর তারা দু’জনে হেঁটে জর্ডান নদী পার হলেন। ওপাড়ে গিয়ে এলিয় ইলিশায়কে বললেন, ‘আমি খুব শীঘ্রই তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আমি চলে যাবার আগে তুমি কি আমার কাছে কিছু চাও যা আমি তোমাকে দিতে পারি?’
ইলিশায় বললেন, ‘আপনি চলে যাবার পরে আপনার জায়গায় আমাকে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। আমি আপনার উত্তরাধিকারী তাই আমাকে আপনার শক্তি দিয়ে যান।’
এলিয় বললেন, ‘একাজ খুবই কঠিন। কিন্তু আমাকে তুলে নেবার সময় তুমি যদি আমাকে দেখতে পাও তবে জানবে যে, তুমি যা চেয়েছ তা পেয়েছ।’
তারা দু’জন কথা বলছেন এমন সময় আগুনের রথ এসে তাদেরকে আলাদা করে ফেলল। ইলিশায় দেখলেন যে, একটি ঘূর্ণিঝড় এলিয়কে স্বর্গে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, আর ইলিশায় একা দাড়িয়ে রইলেন।
মনের দুঃখে ইলিশায় এলিয়ের ফেলে যাওয়া চাদরখানা তুলে নিয়ে নদীর পাড়ে দাঁড়লেন। তিনি নদীর জলকে সেই চাদও দিয়ে আঘাত করে বললেন, ‘এলিয়ের ঈশ্বর সদাপ্রভু কোথায়?’
যেমন আগে হয়েছিল তেমনি তার সামনে জল দু’ভাগ হয়ে গেল। আর তিনি নদী পার হয়ে গেলেন। এই সব ঘটনা যে শিষ্য-নবীরা দেখছিল তারা জানতে পারল যে, এলিয়কে তারা আর দেখতে পাবে না এবং ঈশ্বর ইলিশায়কে এলিয়ের জায়গায় বেছে নিয়েছেন।

শূনেমের একটি বাড়ীতে ইলিশায়

ঈশ্বরের নবী হিসাবে ইলিশায়কে ইস্রায়েল দেশের অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হতো। তিনি ঈশ্বরের আইন-কানুন শিক্ষা দেবার জন্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতেন।
একদিন তিনি শূনেম এলাকায় গেলেন। তখন তার খুব খিদে ও খুব পিাপাসা পেল। এছাড়া তার ¯œান করারও দরকার। তিনি যখন একজন মহিলার বাড়ীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন ঐ মহিলা তাকে তার ঘরে খাবার জন্য নিমন্ত্রণ দিল।
এরপর সেই মহিল তাকে বলল, ‘আবার আমাদের বাড়ীতে আসবেন। আপনার যখন ইচ্ছা তখনই আসবেন।’ এরপর ইলিশায় নিজ কাজে চলে গেলেন।
সেই মহিলার কথাবার্তা ইলিশায়ের খুব ভাল লাগল- সে ছিল যেমন ধনী তেমনি দয়ালু। এরপর ইলিশায় মাঝে-মধ্যেই সেই বাড়ীতে যেতেন।
এরপর সেই মহিলা তার স্বামীকে বলল, ‘এস, আমরা ঈশ্বরের এই লোকটির জন্য একটি ঘর তৈরী করি। তিনি যখনই শূনেমে আসবেন তখন যেন এখানে বিশ্রাম নিতে পারেন ও থাকতে পারেন।
তারা তাদের ছাদে একটি কামরা তৈরী করে দিল। সেখানে বিছানা, টেবিল-চেয়ার ও যা যা দরকার সব দেওয়া হল। এসব দেখে ইলিশায় খুব খুশি হলেন।
তিনি তার চাকর গেহসীকে বললেন, ‘এই লোকেরা আমার জন্য যথেষ্ট করেছে। আমরা কি তাদের জন্য এর পরিবর্তে কিছু করতে পারি না?’
গেহসি বলল, ‘এরা খুবই ধনী লোক। তাদের সবকিছুই আছে। শুধু তাদের একটি সন্তান দরকার।’
তাই ইলিশায় মহিলাটিকে ডেকে বলল, ‘আগামী বছরই তোমার একটি ছেলে হবে।’ এক বছর পর সত্যি তার একটি ছেলে হল। এতে ঐ মহিলা খুবই আনন্দিত হল।
কিন্তু কয়েক বছর পরে তাদের জীবনে শোকের ছায়া নেমে এল। সেই ছোট্ট ছেলেটি তার বাবাকে সবজি বাগানে সাহায্য করার সময় চিৎকার করে বলল, ‘আমার মাথা ব্যাথা! আমার মাথা ব্যাথা!’ তখন তার বাবা তাকে তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিল। কিন্তু কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ছেলেটি মারা গেল।
তার মা তাকে ইলিশায়ের সেই কামরায় নিয়ে গিয়ে সেখানে রেখে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর সে নেমে এসে গাধায় চড়ে ইলিশায়ের কাছে গেল। সে ইলিশায়কে নিয়ে শূনেমে ফিরে এল। ইলিশায় তার কামরায় গিয়ে দেখতে পেলেন যে, তার বিছানায় মৃত ছেলেটিকে শুইয়ে রাখা হয়েছে।
ইলিশায় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে বললেন, ‘হে ঈশ্বর, ছেলেটির প্রাণ ফিরিয়ে দাও।’
তিনি তার মুখ ছেলেটির মুখের উপর রাখলে ছেলেটির শরীর গরম হতে শুরু করল। এরপর ছেলেটি সাতবার হাঁচি দিয়ে চোখ খুলে তাকাল।
তখন ইলিশায় মহিলাটিকে ডাকলেন, ‘তাড়াতাড়ি এস, তোমার ছেলে জীবিত হয়ে উঠেছে ও সুস্থ আছে!’

সিরিয়ার সেনাপতি

নামান ছিলেন সিরিয়া দেশের একজন নামী-দামী লোক এবং রাজার সৈন্যদলের সেনাপতি। একজন মানুষের যা প্রয়োজন- ক্ষমতা, সুনাম, ধন-দৌলত, বাড়ী-ঘর চাকর-বাকর এ সবই তার ছিল। কিন্তু তার ছিল খুব খারাপ চর্মরোগ, আর সেকালে এর কোন ওষুধ ছিল না। এই রোগের কারণে তার ও তার স্ত্রীর মন সবসময় খারাপ থাকত।
ইস্রায়েলীয়দের সঙ্গে সিরিয়ার কোন এক যুদ্ধে ইস্রায়েলীয় ছোট একটি মেয়েকে তারা ধরে এনেছিল। সে নামানের স্ত্রীর কাজের মেয়ে হয়েছিল।
মেয়েটি তার মালিকের স্ত্রীকে বলল, ‘আমাদের ইস্রায়েল দেশে একজন নবী আছেন যিনি আপনার স্বামীকে সুস্থ করতে পারেন।’
তাই সিরিয়া দেশের রাজা সেনাপতি নামানকে ইস্রায়েল দেশে পাঠালেন। নামান ইলিশায়ের খোঁজে তার বাড়ীতে এলেন।
ইলিশায়ের চাকর ঘরের দরজা খুলে নামানকে বলল, ‘আমার প্রভু আপনাকে বলেছেন, আপনি জর্ডান নদীতে গিয়ে সাতবার ডুব দেন, তাতে আপনি সুস্থ হবেন।’
নামান ভাবলেন এ কি ব্যবহার! তিনি ভেবেছিলেন ইলিশায় এসে আশ্চর্য কিছু করবেন। তিনি খুব বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘সিরিয়ায় আরও ভাল নদী আছে। আমাকে শুধুমাত্র ডুব দিতে হবে! কিন্তু তার সংগে আসা তার লোকেরা পীড়াপীড়ি করল যেন তিনি নবীর কথামত ডুব দেন। তখন তিনি জর্ডান নদীতে গিয়ে সাতবার ডুব দিলেন এবং সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেন!
তিনি তাড়াতাড়ি নবী ইলিশায়ের বাড়ীতে ফিরে এসে বললেন, ‘এখন আমি বুঝতে পারছি, ইস্রায়েলের ঈশ্বরই সত্য ঈশ্বর।’

ঈশ্বরের সৈন্য বাহিনী

সিরিয়া ও ইস্রায়েলের সৈন্যবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ বেধে গেল। সিরিয়ার সৈন্যরা গোপনে লুকিয়ে থেকে হামলা করত। কিন্তু ইলিশায় ইস্রায়েলের রাজাকে সাবধান করে দিলেন যেন তিনি সেখানে না যান। যতবার সিরিয়ার রাজা এমন যুদ্ধের পরিচালনা করতেন তা ইলিশায় জানতে পারতেন এবং তিনি ইস্রায়েলের রাজাকে সাবধান করে দিতেন।
একদিন সিরিয়ার রাজা ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে বললেন, ‘ইলিশায়কে খুঁজে বের করে বন্দি করে নিয়ে এস।’
লোকেরা খবর পেল যে ইলিশায় দোথন শহরে আছেন।
সিরিয়ার রাজা রাতের বেলা ঘোড়সওয়ার ও রথ পাঠিয়ে সেই শহর ঘেরাও করে রাখেন। পরদিন সকালে ইলিশায়ের চাকর সেসব সৈন্যদের দেখে খুব ভয় পেল।
সে ইলিশায়কে বলল, ‘আমরা ফাঁদে পড়েছি। এখন আমরা কি করব?’
ইলিশায় কিন্তু একটুও ভয় পেলেন না।
তিনি প্রার্থনা করলেন, হে ঈশ্বর, আমার চাকরের চোখ খুলে দাও।’
তখন তার চোখ খুলে গেল এবং দেখতে পেল আগুনের রথ সিরিয়ার সৈন্যবাহিনীকে ঘেরাও করে আছে। তখন সে জানতে পারল যে, ঈশ্বর তার প্রভুকে যে কোন ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
ইলিশায় তার জীবনকালে অনেক আশ্চর্য কাজ করেছেন। তিনি এতই মহান ছিলেন যে, রাজারা তার কাছে পরামর্শের জন্য আসতেন। তিনি সবসময়ই সাধারণ লোকদের সাহায্য করতেন। তিনি যখন মারা গেলেন তখন গোটা জাতি তার জন্য শোক করেছিল।

২ রাজাবলি ২, ৪-৫

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য লিখতে এখানে ক্লিক করুন

ক্রাইষ্টবিডি রেডিও