বাইবেলের গল্প

এলিয় ও বাল দেবতার নবীরা

ঐারবিয়াম ছিলেন উত্তরের রাজ্যে ইস্রায়েলের প্রথম রাজা। ইস্রায়েলের যেসব রাজা এই রাজার মত হতে চেয়েছেন তারা কেউই ঈশ্বরের বাধ্য ছিলেন না। যারবিয়াম যে ষাঁড়ের মূর্তি বানিয়েছিলেন এসব রাজারা সেই মূর্তির উপাসনা করতেই লোকদের বাধ্য করত।
ইস্রায়েলের সপ্তম রাজা আহাব ছিলেন সবচেয়ে খারাপ রাজা। তিনি সিদোনের রাজার মেয়ে ঈষেবলকে বিয়ে করেন। ঈষেবল ছিল একজন নিষ্ঠুর ও দুষ্ট রাণী। সে বাল দেবতার জন্য একটি বিশেষ মন্দির তৈরী করেছিল। এই বাল ছিল যুদ্ধ ও আবহাওয়ার দেবতা। ঈষেবল ও তার লোকেরা এই দেবতার উপাসনা করত। ঈষেবল ঈশ্বরের অনেক নবীদের- যারা ঈশ্বরকে ভালবাসতেন, তাঁর সেবা করতেন ও লোকদের শিক্ষা দিতেন তাদের হত্যা করেছিল।

কিন্তু আহাবের রাজ্যে তখনও একজন লোক ছিলেন যিনি ঈশ্বরের পক্ষে খুব সাহসের সঙ্গে কথা বলতেন। তার নাম নবী এলিয়।
একদিন ঈশ্বর এলিয়কে বললেন, ‘তুমি আহাব রাজার কাছে যাও এবং তাকে বল যে, সে যেসব কাজ করছে তা আমি দেখেছি। তুমি তাকে বল যে, যতক্ষণ আমি না বলি ততক্ষণ ইস্রায়েল দেশে কোন বৃষ্টি হবে না।’
এলিয় গিয়ে রাজাকে এ কথা বললেন। এরপর ঈশ্বর তাকে জর্ডান নদীর অন্য পাশে একটি ঝর্ণার কাছে নিরাপদ স্থানে লুকিয়ে থাকতে বললেন। সেখানে এলিয় প্রতিদিন ঝর্ণা থেকে জল খেতেন। আর ঈশ্বর কিছু কাক পাঠিয়ে দিতেন, তারা তাকে মাংস যুগিয়ে দিত। কিন্তু কিছুদিন পরে সেই ঝর্ণা শুকিয়ে গেল কারণ সেখানে কোন বৃষ্টি হত না।

তখন ঈশ্বর এলিয়কে বললেন, ‘তুমি সিদোনের কাছে শারিফত গ্রামে যাও। সেখানে এক বিধবা আছে। সে তোমাকে খাবার দেবে।
ঈশ্বরের কথামত এলিয় সেই গ্রামে গেলেন। তিনি দেখতে পেলেন এক বিধবা খড়কুটা কুড়াচ্ছে। এলিয় তাকে বললেন, ‘দয়া করে আমাকে একটু জল ও এক টুকরা রুটি খেতে দেও মা।’
বিধবা বলল, ‘আমার কাছে কোন রুটি নেই, শুধুমাত্র একটু আটা ও একটু জলপাইয়ের তেল আছে। আমি এই খড়কুটা নিয়ে যাচ্ছি, অবশিষ্ট আটা ছেনে রুটি করে আমরা শেষ খাবার খাব। তারপর মারা যাব।’
এলিয় বললেন, ‘ভয় কোর না, আটা ছেনে প্রথমে আমার জন্য একটা রুটি বানিয়ে নিয়ে এস। ঈশ্বর বলেছেন, যতদিন না দুর্ভিক্ষ শেষ হয় ততদিন তোমার ঘরের আটা ও তেল শেষ হবে না।’
এলিয় যা বলেছিলেন বিধবা মহিলাটি তা-ই করল। আর এলিয় যা বলেছিলেন ঠিক তা-ই হল। টিনের আটা ও বোতলের তেল শেষ হচ্ছিল না। দিনের পর দিন সে আটা ছেনে রুটি ভাজছিল কিন্তু তা কমছিল না। হঠাৎ সেই বিধবার ছেলে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল এবং একময় সে মারা গেল।

সেই বিধবা এলিয়কে বলল, ‘আপনি কি করছেন? আপনি কি আমাকে শাস্তি দিচ্ছেন? আমি যে অন্যায় করেছি তা কি আপনি ঈশ্বরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন?’ সেই বিধবা খুবই কাঁদতে লাগল।
এলিয় বললেন, ‘ছেলেটিকে আমার কাছে দেও।’ তারপর সেই ছেলেটিকে নিয়ে উপরের কামরায় তিনি যেখানে থাকতেন সেই বিছানায় শুইয়ে দিলেন।
এলিয় জোরে জোরে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে বললেন, ‘হে ঈশ্বর তুমি জান, এই বিধবা আমার প্রতি কত দয়া করেছে, দয়া করে তুমি এই ছেলের জীবন ফিরিয়ে দেও।’
এভাবে তিনবার প্রার্থনা করবার পর ঈশ্বর সেই ছেলের জীবন ফিরিয়ে দিলেন।
এ দেখে সেই বিধবা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে ছেলেটিকে কোলে তুলে নিল এবং এলিয়কে গিয়ে বলল, ‘এখন আমি বুঝতে পারছি যে, আপনি সত্যিই একজন ঈশ্বরের লোক এবং আপনি যা বলেন তা ঘটে।’

একটি চ্যালেঞ্জ

তিন বছর সে দেশে কোন বৃষ্টি হল না এবং লোকেরা না খেয়ে খুব কষ্ট পাচ্ছিল। তখন ঈশ্বর এলিয়কে রাজা আহাবের কাছে যেতে বললেন।
রাজা এলিয়কে বললেন, ‘আপনি কেন এসেছেন? আপনি তো ইস্রায়েলে বিপদ ডেকে এনেছেন।’
এলিয় বলল, ‘এটা সত্যি নয়। আপনিই ঈশ্বরের অবাধ্য হয়ে বাল দেবতার পূজা করে ইস্রায়েলে বিপদ ডেকে এনেছেন। এখন সব লোকদের ও বাল দেবতার নবীদের কর্মিল পাহাড়ে আমার মুখোমুখি হতে বলুন।’
এলিয় বা বললেন রাজা তা-ই করলেন।
সবাই কর্মল পাহাড়ে এল। এলিয় তাদের বললেন, ‘এখনই আপনাদের মন স্থির করার সময়। আপনারা একই সময়ে বাল দেবতার ও ঈশ্বরের সেবা করতে পারেন না। আসুন, আমরা দেখি প্রকৃত ঈশ্বর কে। যদি সদাপ্রভু ঈশ্বর হন তবে তাঁর সেবা করুন আর যদি বাল দেবতা ঈশ্বর হন তবে তার সেবা করুন।’
এরপর তিনি বাল দেবতার নবীদের দিকে ঘুরে তাদের বললেন, ‘আসুন, আমরা একটি বলিদান উৎসর্গ করি। প্রথমে আপনারা একটি ষাঁড় নিয়ে বালদেবতার কাছে উৎসর্গ করুন, তারপর আমি একটি ষাঁড় নিয়ে ঈশ্বরের কাছে উৎসর্গ করব। যিনি আগুনের মধ্য দিয়ে উত্তর দেবেন তিনিই হবেন সত্য ঈশ্বর হবেন।’
তখন বাল দেবতার নবীরা একটি বেদী তৈরী করল। তারা কাঠ এনে বেদিও উপর দিল এবং একটি ষাঁড় জবাই করে তার উপর রাখল।
এরপর তারা সারাদিন ধরে চিৎকার করে বাল দেবতাকে ডাকতে লাগল, ‘হে বাল দেবতা আমাদের কথা শোন।’ তারা চিৎকার করতে করতে নিজেদের শরীরে আঘাত করে রক্ত ঝড়াতে লাগল কিন্তু কিছুই হল না; কোন উত্তর এল না।

এরপরে এলিয়ের পালা। তিনি একটি বেদি তৈরী করে তার উপর কাঠ দিলেন এবং একটি ষাঁড় জবাই করে তার উপর রাখলেন। তারপর সেই বেদি, কাঠ ও ষাঁড়ের উপর জল ঢাললেন যেন কাঠগুলো ভিজে যায়। তারপর সেই বেদির চারদিকে একটি নালা খুড়ে তাও জল দিয়ে ভরে দিলেন।
এরপর তিনি প্রার্থনা করলেন, ‘হে ইস্রায়েলের ঈশ্বর, তুমি লোকদের দেখিয়ে দাও যে, তুমিই সত্য ঈশ্বর।’
আর সংগে সংগে ঈশ্বর আগুন পাঠালেন আর আগুন সেই জল শুকিয়ে ফেলল এবং বলি উৎসর্গ গ্রহণ করল।
লোকেরা যখন এসব দেখল তখন তারা ভূমিতে উবুর হয়ে সদাপ্রভুকে প্রণাম করে বলতে লাগল, ‘সদাপ্রভুই ঈশ্বর! সদাপ্রভুই একমাত্র ঈশ্বর! এরপর তারা বাল দেবতার সব পুরোহিতদের ধরে মেরে ফেলল, কাউকে পালাতে দিল না।

তখন এলিয় বৃষ্টির জন্য ঈশ্বরের কাছে অনুরোধ করলেন। কিছু সময়ের মধ্যেই বাতাস বইতে শুরু করল, আকাশ কালো হয়ে উঠল এবং বৃষ্টি পড়তে শুরু করল।
এলিয়ের জন্য এটি ছিল একটি বিশেষ দিন। তিনি এই বৃষ্টির মধ্যে রাজার রথের আগে আগে দৌড়ে যিষ্রিয়েলের রাজবাড়ী পর্যন্ত গেলেন।
পরের দিন সবকিছুই যেন আবার উল্টা পাল্টা হয়ে গেল। এলিয় আবার দৌড়ালেন- কিন্তু এবার তার প্রাণ বাঁচাবার জন্য। রাণী ঈষেবল তাকে মেরে ফেলতে চাইল। তাই তিনি মাইলের পর মাইল দৌড়ালেন, যতক্ষণ না মরুভূমিতে এসে পৌঁছালেন। তিনি সেখান থেকে গেলেন সিনাই পাহাড়ে।
ঐ সময় তিনি ভীষণ একা হয়ে পড়লেন। চারিদিকে নীরব; কোথাও কোন শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। তখন ঈশ্বরের আওয়াজ তার কানে এল।
‘তুমি এখানে কি করছ, এলিয়?’

এলিয় উত্তরে বলেলেন, ‘হে ঈশ্বর রাণী ঈষেবল তোমার সব নবীদের মেরে ফেলেছে, আমি একাই মাত্র বেঁচে আছি, সে আমাকেও মেরে ফেলতে চাইছে।
ঈশ্বর তাকে বললেন, ‘ফিরে যাও। সেখানে এখনও তোমার অনেক কাজ আছে। ঈষেবল ও আহাবাকে আমার হতে ছেড়ে দাও। তুমি গিয়ে ইলিশায়ের খোঁজ কর। সে তোমার পরে নবী হবে। তুমি ভেব না যে তুমি একা। এখনও সাত হাজার লোক ইস্রায়েলে আছে যারা কখনও বাল দেবতার পূজা করে নি।’
এই কথা শুনে এলিয় সাহস পেলেন। তিনি ফিরে এসে ইলিশায়ের দেখা পেলেন। তখন ইলিশায় জমি চাষ করছিলেন। এলিয় তার চাদর ইলিশায়ের কাঁধে জড়িয়ে দিলেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি দেখালেন যে, ইলিশায় তার পরে নবী হবেন। ইলিশায় তার বাড়ী ঘর সবকিছু ছেড়ে এলিয়ের পিছনে পিছনে চললেন।

১ রাজাবলি ১৭-১৯

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য লিখতে এখানে ক্লিক করুন

ক্রাইষ্টবিডি রেডিও