বাইবেলের গল্প

ইষ্রা ও নহিমিয় – যিরূশালেমে ফিরে আসা!

কোরস নামে পারস্যের যে রাজা তখন বাবিল দেশ শাসন করেছিলেন তিনি ছিলেন খুব ভাল একজন রাজা। তিনি একটি ঘোষণা দিলেন:
‘ঈশ্বর আমাকে বলেছেন যে, যিহূদীরা*, অর্থাৎ ঈশ্বরের লোকেরা যেন তাদের দেশে ফিরে গিয়ে যিরূশালেমে তাদের মন্দির নির্মাণ করে। তারা এখন নিজেদের দেশে ফিরে যেতে পারে। রাজা নবূখদ্নিৎসর মন্দিরটি ধ্বংস করবার আগে সেখান থেকে যে ধন-সম্পদ নিয়ে এসেছিলেন তা সবই তাদের ফিরিয়ে দেব।’

সেদিন বাবিলের রাস্তা ঘাটে সে কি আনন্দের ধ্বনি!
যিহুদীরা চিৎকার করে বলল: ‘বন্দিদশার দিন শেষ। ঈশ্বর তাঁর প্রতিজ্ঞা রক্ষা করেছেন। আমরা এখন বাড়ী ফিরে যেতে পারি।’

ঈশ্বরের লোকেরা তাদের নিজেদের দেশে আবার ঈশ্বরের সেবা করবার জন্য অপেক্ষা করছিল। এই বন্দিদশায় থাকা কালে তারা তাদের চেতনা ফিরে পায় এবং ঈশ্বরকে ভালবাসতে ও তাঁর বাধ্য থাকতে শেখে।
বিয়াল্লিশ হাজার লোক তাদের চাকর-চাকরানী ও ধন-সম্পদ নিয়ে মরুভূমি পার হয়ে আসবার জন্য প্রস্তুত হল। তারা ঘোড়া, গাধা ও উটের পিঠে তাদের জিনিসপত্র চাপিয়ে ও পথের জন্য খাবার সঙ্গে নিয়ে রওনা হল।

অবশেষে তারা যখন যিরূশালেমে ফিরে এল, প্রথমে তারা ঈশ্বরের মন্দির তৈরী করার কথা চিন্তা করল। মন্দির তৈরী করার জন্য তারা তাদের সোনা ও রূপা উপহার দিল। খুব আগ্রহভরেই তারা মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করল। যিহুদীদের বিদেশে থাকার সময় যারা যিরূশালেমে বাস করছিল তারাও অনেক সাহায্য করতে চাইল।
তারা বলল, ‘আমরাও ঈশ্বরের উপাসনা করি।’
কিন্তু যিহূদীরা একারাই এই কাজ করতে চাইল।

তখন দেশে যারা বাস করছিল তাদের কেউ কেউ নির্মাণ কাজে বাধা দেয়ায় অনেক দিন কাজ বন্ধ রইল। এই সময় নবীরা আবারও লোকদের উৎসাহ দিতে শুরু করলেন।
*তাদের এই নাম দেওয়া হয়েছিল কারণ তারা যিহুদী বংশ থেকে এসেছিল।
তারা বললেন, ‘আপনাদের লজ্জ্বা হওয়া উচিৎ। আপনারা আপনাদের ঘর নিয়ে ব্যাস্ত অথচ ঈশ্বরের ঘর ভাঙ্গাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে।’
এরপর আবারও যিহূদীরা মন্দিরের কাজ আরম্ভ করে। শেষে একদিন মন্দিরের কাজ শেষ হয়। রাজা শলোমনের তৈরী মন্দিরের মত এটি তত জাঁকজমক পূর্ণ ছিল না বটে তবে তা সুন্দর একটি দালান হয়েছিল।

বুদ্ধিমান ইষ্রা

অনেক বছর পার হয়ে গেল। সেই বাবিল দেশে ইষ্রা নামে একজন বুদ্ধিমান লোক ঈশ্বরের বাক্য অধ্যয়ন করেছিলেন। তিনি খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি জানতেন, ইস্রায়েল দেশে যে যিহূদীরা ফিরে গেছে তারা ঈশ্বরের আইন-কানুন জানে না। তিনি রাজার কাছে অনুমতি চাইলেন ইস্রায়েল দেশে গিয়ে যেন তাদের আইন-কানুন শিক্ষা দিতে পারেন।
রাজা ইষ্রাকে খুব সম্মান করতেন। রাজা বললেন, ‘আপনি যান, অন্যেরা যারা যেতে চায় তাদেরও আপনার সঙ্গে নিন। আমি ঈশ্বরের মন্দিরের জন্য সোনা ও রূপা দেব এবং আপনার যা যা প্রয়োজন তাও দেব।’
ইষ্রা ভাবলেন, ‘ঈশ্বরই রাজার মনে এসব ইচ্ছা দিয়েছেন। যাত্রাপথ খুবই বিপদের হবে। হতে পারে রাস্তায় ডাকাতেরা ওৎ পেতে থাকবে। কিন্তু ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করতে সমর্থ। আমি রাজার কাছে কোন সৈন্য চাইব না।’
সত্যিই, ঈশ্বর তাদের নিরাপদে যিরূশালেমে নিয়ে এলেন।

যিরূশালেমে এসে ইষ্রার অনেক মন্দ বিষয় চোখে পড়ল। অনেক লোক বিজাতীয় মেয়েদের বিয়ে করেছে এবং তারা তাদের সঙ্গে নিজেদের দেবদেবী নিয়ে এসেছে। এরকম পাপের কারণেই তাদেরকে বন্দিদশায় পড়তে হয়েছিল।
ইষ্রা বললেন, ‘ঈশ্বরের সঙ্গে আপনারা যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তা আপনারা ভঙ্গ করেছেন। এই সব সমস্যা দূর করতে হবে।’ তাই ইস্রা লোকদের ঈশ্বরের আইন-কানুন মানতে শিক্ষা দিতে লাগলেন।

শাসনকর্তা নহিমিয়

ঈশ্বরের মন্দির তৈরীর কাজ শেষ হয়েছে কিন্তু যিরূশালেম তখনও ধ্বংসস্তূপ হয়ে আছে। শহরের দেয়াল পুড়ে ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ে আছে।
এই খবর যখন পারস্য দেশের রাজপ্রাসাদে নহিমিয়ের কাছে এল তখন তিনি মনের দুঃখে কেঁদে ফেললেন।
নহিমিয় ছিলেন রাজ দরবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ লোক। পারস্য রাজার দরবারের পানীয় পরিবেশনের দায়িত্ব ছিল তার উপর। তিনি ছিলেন যিহূদী। তিনি ঈশ্বরকে ভালবাসতেন এবং তাঁর লোকদের খুব যত্ন নিতেন।

তিনি একদিন উপবাস এবং প্রার্থনা করে কাটালেন। তার চেহারায় দুঃখের ছাপ ছিল এবং রাজা তা দেখেই বুঝতে পারলেন।
রাজা বললেন, ‘ব্যাপার কি?’
উত্তরে নহিমিয় বললেন, ‘হে রাজা, যিরূশালেম ধ্বংস স্তূপ হয়ে পড়ে আছে।’ এরপর তিনি মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলেন যেন রাজা তাকে সাহায্য করেন এবং তখনই রাজাকে বললেন, ‘দয়া করে আমাকে আমার দেশে ফিরে গিয়ে যিরূশালেম শহরকে মেরামত কতে সুযোগ দিন।’
ঈশ্বর নহিমিয়ের প্রার্থনার উত্তর দিলেন। রাজা শুধু তাকে অনুমতিই দিলেন না, সেই প্রদেশের শাসনকর্তাকে আদেশ দিলেন যেন নহিমিয়ের যা যা দরকার তা দিয়ে তার দেশে যেতে তাকে সাহায্য করে।
অবশেষে নহিমিয় যিরূশালেমে ফিরে এলেন।

তিনি রাত অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। তারপর তিন গোপনে শহরের চারপাশে ঘুরে দেয়ালের অবস্থা কি তা দেখলেন।
পরের দিন তিনি পুরোহিত, নেতা ও সাধারণ লোকদের সঙ্গে কথা বললেন।
তিনি বললেন, ‘এই ভাঙ্গা দেয়াল আমাদের জন্য অসম্মানের। আসুন, এটি নতুনভাবে তৈরী করি! ঈশ্বর আমাদের সাহায্য করবেন।’ ঈশ্বর কিভাবে তার প্রার্থনার উত্তর দিয়েছেন এবং পারস্য রাজা কিভাবে তাকে আসতে সাহায্য করেছেন তা কি তাদের বললেন।

নহিমিয় জানতেন কিভাবে প্রার্থনা ও কাজ দু’টিই করতে হয়। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি যিহূদার শাসনকর্তা হলেন এবং তিনি সকলকে ভাল কাজের জন্য একতাবদ্ধ করলেন। প্রত্যেক পরিবার তাদের বাড়ীর কাছের দেয়ালের অংশ মেরামত করবে। তারা সবাই প্রস্তুত হয়ে ভাল কাজ করতে প্রস্তুতি নিল।
কিন্তু যারা দেশে থাকত তারা ভয় পেল। যিরূশালেমে আবার একটি শক্ত দেয়াল হোক তা তারা চাইত না। তারা যে কোন উপায়ে কাজ বন্ধ করতে চাইল।

প্রথমে তারা যিহুদী শ্রমিকদের সঙ্গে তামাশা শুরু করল। তাদের বলল, ‘কি রকম দেয়াল তৈরী করছ বলে তোমরা ভাবছ? মনে তো হয় একটি শিয়ালও যদি তাতে গুঁতো মারে তবে তা ভেঙ্গে পড়বে।’
কিন্তু যিহূদী লোকেরা খুব মনোযোগ দিয়েই তাদের কাজ চালিয়ে যেতে লাগল। দেয়ালের উচ্চতা আস্তে আস্তে বাড়তে লাগল।
তখন তাদের শত্রুরা তাতে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করল। নহিমিয় ঈশ্বরের সাহায্য চাইলেন। তারা দেয়াল পাহারা দেবার ব্যবস্থা করলেন। অর্ধেক লোক কাজ করত আর বাকী অর্ধেক লোক তাদের অস্ত্র নিয়ে পাহারা দিত।

এরপর শত্রুরা নতুন চাল শুরু করল।
তারা বলল, ‘আমরা তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই।’
উত্তরে নহিমিয় বলল, ‘আমাদের কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাজ বন্ধ করে কথা বলবার সময় আমাদের নেই।’

এরপর তারা নহিমিয়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলে ভয় দেখাল যে, নহিমিয় রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিকল্পনা করছে। কিন্তু তাতে নহিমিয় ভয় পেলেন না।
ঈশ্বরের সাহায্যে অবশেষে দেয়াল তৈরীর কাজ শেষ হল। এটির কাজ শেষ করতে বাহান্ন দিন লেগেছিল। যিরূশালেম শহরের চারিদিকে আবার একটি শক্ত দেয়াল হল- এটি এই শহরের একটি গর্বের বিষয় ছিল।
তারপর যিহূদীরা একটি বিশেষ উৎসবের আয়োজন করল। তারা ঈশ্বরের ধন্যবাদের গান গাইতে গাইতে শহরের দেয়ালের উপর দিয়ে মিছিল করে ঘুরে বেড়াল। পুরোহিতেরা তাদের শিংগা বাজালেন, বাদকেরা বাজনা বাজাল, সবার মন খুশিতে ভরে উঠল।

বুদ্ধিমান ইষ্রা ঈশ্বরের আইন-কানুন জোরে জোরে লোকদের কাছে পড়ে তার অর্থ ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিলেন। লোকেরা তাদের পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চাইল। তারা ঈশ্বরের আইন-কানুন পালন করবে ও তাঁকে ভালবাসবে বলে প্রতিজ্ঞা করল।
তাই শাসনকর্তা নহিমিয় ও বুদ্ধিমান ইষ্রা ঈশ্বরের লোকদের আইন-কানুনের বিষয়ে ও কিভাবে তাদের জীবন-যাপন করতে হবে সেই বিষয়ে শিক্ষা দিলেন।

ইষ্রা, নহিমিয়

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য লিখতে এখানে ক্লিক করুন

ক্রাইষ্টবিডি রেডিও



আলাদা বক্সে রেডিও শুনুন