প্রবন্ধ

নাবিল কুরেশি (১৯৮৩-২০১৭) আল্লাহকে খুঁজে যীশুকে পেলেন

নাবিল কুরেশি
প্রায় এক বছর ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে গত ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০১৭ শনিবার নাবিল কুরেশি প্রভুর কোলে শায়িত হন।

নাবিল কুরেশি ও ইসলাম

নাবিল কুরেশি আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা-মা ছিলেন পাকিস্তানী স্বরনার্থী। তারা আহমেদীয়া সম্প্রদায়ের হওয়ায় প্রচলিত মুসলিমদের চাপের মুখে তারা আমেরিকায় পালিয়ে যায়। নাবিল কুরেশির পরিবার খুবই ধর্মশীল জীবন যাপন করতেন এবং তাকেও সেভাবেই শিক্ষা দিতেন। ইংরেজি ভাষা শেখার আগেই তার মা তাকে উর্দু ও আরবি ভাষা শেখান। মাত্র ৪ বছর বয়সে তিনি এই দুই ভাষায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন এবং ৫ বছর বয়সে তিনি আরবিতে সম্পুর্ণ কোরান পড়েন এবং অনেক সুরা মুখস্ত করে ফেলেন।

খ্রীষ্টের সম্মুখীন

২০০১ সালে তিনি তার ইউনিভার্সিটির এক সহপাঠীকে বাইবেল পড়তে দেখে তাকে চ্যালেঞ্জ করে বসলেন। তিনি বললেন, সময়ের সাথে সাথে বাইবেলকে বিকৃত করা হয়েছে। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হলো এবং কয়েক বছর ধরে তাদের এই বিতর্ক চলল। তার সেই বন্ধুর বিভিন্ন যুক্তির মাধ্যমে এবং নিজে পরীক্ষা করে তিনি বাইবেলকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করতে লাগলেন। এরপর তিনি তার পরের বিতর্কের বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন, তিনি বললেন “যীশু কখনও নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করেননি”। সেটাও যখন মিথ্যা বলে প্রমাণ হলো, তখন তিনি বললেন, যীশু ক্রুশে মারা যাননি। কিন্তু আবারও তার সত্য জানার আগ্রহের কারণে তিনি বিভিন্ন প্রমাণ দেখতে পেলেন এবং নিজের মত পরিবর্তন করলেন। এর পরের প্রশ্ন ছিল, একজন ব্যক্তি কিভাবে অন্যের পাপ বহন করতে পারে, আর এক ঈশ্বর কিভাবে ত্ৰিত্ব হতে পারে। এর উত্তর তিনি নিজেই বাইবেল থেকে খুঁজতে লাগলেন। এরপর সেই বন্ধুটি নাবিল কুরেশিকে তার বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করল, কিন্তু এর উত্তর দিতে গিয়ে সে অনেক ত্রুটি খুঁজে পেতে শুরু করলেন।

এরপর ২০০৪ এর ডিসেম্বর থেকে ২০০৫ এর এপ্রিল মাসের মধ্যে তিনি তিনবার স্বপ্ন দেখলেন যে খ্রীষ্টই একমাত্র সত্য এবং তার খ্রীষ্টকে গ্রহণ করা উচিৎ। তিনি ইসলাম নিয়ে যে সব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন তার উত্তর জানার জন্য সে বছর তিনি ওয়াসিংটন, কানাডা এবং ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় গেলেন। কিন্তু তিনি কোন সদুত্তর খুঁজে পেলেন না।

নাবিল কুরেশি ও যীশু খ্রীষ্ট

যীশু খ্রীষ্ট সম্পর্কে সত্য জানতে পেরে নাবিল খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। কারণ তিনি যে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিলেন, তা সহজ হবে না। তার সারা জীবনের বিশ্বাস ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। তার পরিবার তাকে কি আর গ্রহণ করতে পারবে? তিনি যীশুকে বললেন, “এই সিদ্ধান্ত আমার কাছে মৃত্যুর সামিল”। তিনি আর কিছু ভাবতে না পেরে বাইবেল খুলে নতুন নিয়ম পড়তে শুরু করলেন। কিছুক্ষন পড়তেই তিনি খুঁজে পেলেন, “যারা দুঃখ করে তারা ধন্য, কারণ তারা সান্ত্বনা পাবে।” (মথি ৫:৪)।

তিনি নতুন উদ্যমে বাইবেল পড়তে থাকলেন। মথি ১০:৩৭ পদে তিনি পেলেন নিজের পিতা-মাতার থেকেও প্রভুকে বেশি ভালবাসতে হবে। কিন্তু তিনি যীশুকে বললেন, “এটা আমার কাছে মৃত্যুর সমান। আমার সব কিছু শেষ হয়ে যাবে”।

এর উত্তরও তিনি একটু পরই পেয়ে গেলেন, “যে কেউ নিজের জীবন রক্ষা করতে চায় সে তার সত্যিকারের জীবন হারাবে; কিন্তু যে কেউ আমার জন্য তার প্রাণ হারায় সে তার সত্যিকারের জীবন রক্ষা করবে”। যীশুর এই কথাগুলো তার কাছে খুব স্পষ্ট উত্তর বলে মনে হলো। তার মনে হলো, একজন মুসলমানের জন্য যীশু সুসমাচার গ্রহণ করা সহজ ব্যাপার নয়। এটা মৃত্যুর সামিল। তিনি হাটু গেড়ে বসলেন এবং নিজের জীবন যীশুকে দিলেন।

তার পরিবার এ খবর জানতে পেরে খুবই দুঃখ পেল। তারা মনে করল তাদের ছেলে তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তার পরিবারের সবাই ভেঙ্গে পড়ল। কিন্তু যীশু খ্রীষ্টই একমাত্র মুক্তির পথ। যীশু খ্রীষ্টের উপর নির্ভর করে তিনি এই দুঃখকে জয় করলেন। তিনি যীশুর আরও কাছাকাছি আসলেন এবং প্রার্থনার জীবন যাপন করতে শুরু করলেন।

প্রভুর পক্ষে কাজের শুরু

এরপর নাবিল কুরেশি বায়োলা ইউনিভার্সিটিতে খ্রীষ্টিয়ান এপলোজেটিক্স নিয়ে পড়াশোনা করতে যায়। ২০০৮ সালে সেখানে গ্রাজুয়েশন শেষ করে। একই সাথে তিনি ২০০৯ সালে ইস্টার্ন ভার্জিনিয়া মেডিকেল স্কুল থেকে মেডিকেল ডিগ্রিও লাভ করেন। এরপর ২০১২ সালে ডিউক ইউনিভার্সিটি থেকে ধর্মতত্ত্বের উপর এমএ শেষ করে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এম.ফিল এবং পি.এইচ.ডি করতে শুরু করেন। ২০১৩ সালে তিনি রবি জাকারিয়া ইন্টারন্যাশনাল মিনিষ্ট্রিতে ভ্রামমান বক্তা হিসেবে যোগ দেন।

ফেব্রুয়ারী ২০১৪ সালে নাবিল কুরেশি তার প্রথম বই প্রকাশ করেন, Seeking Allah, Finding Jesus: A Devout Muslim Encounters Christianity, এই বইটি নিউ-ইয়র্ক টাইম পত্রিকায় বেষ্ট সেলারের তালিকায় উঠে আসে এবং এক সাথে “সেরা নতুন লেখক” এবং “সেরা অ-কাল্পনিক বই”-এর পুরস্কার পায়।

২০১৫ সালে নাবিলের স্ত্রী মিশেল একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়। মার্চ ২০১৬ সালে জনডোভান প্রকাশ করে নাবিলের আরেকটি বই “Answering Jihad: A Better Way Forward”। তার মাত্র পাঁচ মাস পর আগষ্ট ২০১৬ তে জনডোভান নাবিলের আরেকটি বই প্রকাশ করে, যার নাম “No God But One: Allah or Jesus? A Former Muslim Investigates the Evidence for Islam and Christianity”।

ক্যান্সার

“No God But One” – এই বইটি যেদিন প্রকাশ করা হয়, সেদিনই নাবিল সুরেশি তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন তার পাকস্থলীতে ক্যান্সার ধরা পরেছে। ২০১৬ এর অক্টোবর মাসে নাবিলের স্ত্রী মিশেলের গর্ভপাত হয়। মে ২০১৭তে নাবিল কুরেশি ঘোষনা করেন তার ক্যান্সারের চিকিৎসায় তার শারিরীক কোন উন্নতি হয়নি বরং ক্যান্সার আরও ছড়িয়ে পড়েছে। তখন তার বাবা-মা তার বাড়ি হাউসটনে আসেন এবং তার দেখা-শোনা করতে থাকেন।

সেপ্টেম্বর ২০১৭তে তার ডাক্তার তাকে “পেলিয়াটিভ কেয়ার”-এ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, কারণ তার আর কোন চিকিৎসা করা সম্ভব ছিল না। এবং প্রায় এক বছর ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে গত ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০১৭ শনিবার নাবিল কুরেশি প্রভুর কোলে শায়িত হন।

 

১টি মন্তব্য

মন্তব্য লিখতে এখানে ক্লিক করুন