প্রবন্ধ

সম্ভাষণ!

“ঊর্ধ্বলোকে ঈশ্বরের মহিমা, পৃথিবীতে [তাঁহার] প্রীতিপাত্র মনুষ্যদের মধ্যে শান্তি।” -(লূক ২:১৪)

মহাপবিত্র জীবন্ত ঈশ্বরের জীবন্ত বাক্য আমাদের শান্তি। আমরা মাতৃভাষায় পবিত্র বাইবেল পাঠ করতে পারছি এটি অত্যন্ত গৌরব ও আনন্দের বিষয়। বাইবেলে আমরা শান্তি শব্দটি আদিপুস্তক ১৫:১৫ পদে দেখতে পাই। এখানে ঈশ্বর অব্রামকে এরূপ বলেছেন; “আর তুমি শান্তিতে আপন পূর্বপুরুষদের নিকটে যাইবে, ও শুভ বৃদ্ধাবস্থায় কবর প্রাপ্ত হইবে।” এটি সাধারন কোন বিষয় অথবা কথার কথা নয়। এটি অব্রামের সাথে ঈশ্বরের কৃত চুক্তি। ঈশ্বর বহু স্থানে শান্তির কথা বলেছেন। আমরা যদি গীতসংহিতা ২৯:১১ পদ দেখি; “সদাপ্রভূ আপন প্রজাদিগকে বল দিবেন; সদাপ্রভূ আপন প্রজাদিগকে শান্তি দিয়া আশির্বাদ করিবেন।” বলে রাখা দরকার বাংলা ‘শান্তি’ শব্দটি যেটি বাইবেলে ব্যবহার করা হয়েছে সেটি হিব্রু ‘শ্যালোম’ থেকে এসেছে।

মিশন কাজে যুক্ত হওয়ার সুবাদে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন কি ইউনিয়ন বা গ্রাম পর্যায়ে অবস্থানের বহু সুযোগ ঘটেছে আমার। ভৌগোলিক পরিবেশ ও জলবায়ুগত ভিন্নতা ছাড়াও শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক মান আপেক্ষিক হওয়ার কারণে অঞ্চল ভেদে মানুষের চলন বলন চিন্তা চেতনায়ও যথেষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। আর ধর্মীয় উপলব্ধিও যেহেতু এর সাথেই জড়িত, তাই এ ক্ষেত্রেও যথেষ্ট বৈচিত্র্য দেখা যায়। কিন্তু ধর্মীয় গোড়ামীর ক্ষেত্রে শিক্ষিত অশিক্ষিত আবহাওয়া জলবায়ু নির্বিশেষে অভিন্ন মিলই চোখে পড়েছে বেশি। এর রেশ ধরে শুরুতেই যে সালাম সম্ভাষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে অনেক বিপত্তির সম্মুখিন হতে হয়েছে আমাকে। শুধু কি সংখ্যালঘু খৃষ্টান হওয়ার কারণেই?

পবিত্র বাইবেল যেহেতু শান্তি কামনা করার অধিকার আমাকে দিয়েছে; সেহেতু আমার এটি চর্চা করতে অসুবিধা কোথায়? আমার সমাজ, আমার সংস্কৃতি তো আমি বিসর্জন দিতে পারিনা। প্রভূ যিশু কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ধর্মের অনুসারীদের সালাম দিতে বারণ করেননি। মুক্তিদাতা হিসেবে তিনি সমগ্র সৃষ্টির একমাত্র ভজনা পাবার যোগ্য প্রভূ। তিনি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা জাতির জন্য তার বাক্য দেননি। তার বাক্য বা শিক্ষা চিরন্তন। আমি একজন খৃষ্টান বলে কি অন্য ধর্মের মানুষের জন্য শান্তি কামনা করতে পারিনা? একবার এক বায়োজ্যষ্ঠ হুজুরগোছের এক ব্যক্তিকে ‘স্লামালিকুম’ সম্ভাষণ করতে গিয়েই বিপত্তি বাঁধলো।

আরবী ‘আস্ সালাম ওয়ালাইকুম…’। এর বাংলা তরজমাটা আমরা সবাই জানি- আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আরবী ও হিব্রু ভাষাকে একে অপরের বোন বলা হয়। ‘আস্ সালাম ওয়ালাইকুম…’ কথাটার আক্ষরিক ও ভাবগত অর্থ এতো চমৎকার যে, ‘আদাব’ শব্দটিকে সে তুলনায় অর্থহীনই মনে হয়। যদিও ফারসি ‘আদাব’ -কে আমি মোটেও ছোট করে দেখছি না, বরং এর সাথে আমাদের এই উপমহাদেশিয় সভ্যতার ইসলামী শাসন পর্বের রাজসিক সংস্কৃতির কৌলিন্য মিশে আছে। তবু আমি আদাব শব্দটিকে পারতপক্ষে ব্যবহার করি না। সে তুলনায় চলমান অভ্যস্ততার কারণেই হয়তো ‘আস্ সালাম ওয়ালাইকুম’ বা এর গতিশীল অপভ্রংশ ‘স্লামালিকুম’ ব্যবহারে অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। যদিও বাংলার প্রতি আমার পক্ষপাত সবচেয়ে বেশি। তবে আরবি কায়দায় বললে যেভাবে শান্তি বর্ষিত হয় সম্ভবত বাংলায় বললে বর্ষণটাঁ সেভাবে হয় না।

বিখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ রেভা. এডওয়ার্ড আইয়ুবের লেখা ‘পাক কিতাবের আলোকে আপনার প্রশ্নের উত্তর’ বইয়ের পৃষ্ঠা ৪২ এ লেখা আছে; “আসলে ভাষা নিয়ে কোন বড়াই করা যায় না। আরবি কোন একক অতুলনীয় ভাষা নয়। কুরআন এসেছে মনে করে মুসলমানরা এ ভাষাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকে। কিন্তু আরবি একটি ভাষা যেখানে বিভিন্ন ভাষার প্রভাব রয়েছে। হিব্রু, অরামিয় ও আরবি ভাষা খুব কাছাকাছি। যিশু খ্রীষ্ট অরামিয় ভাষাতে কথা বলতেন। হযরত মুহম্মদ আরব দেশের লোক। আরবি তার মাতৃভাষা। হিন্দু ধর্মের উৎপত্তি সিন্ধু নদের পারে। তাই হিন্দি যদি তাদের ভাষা হয়, তাহলে তো ভাষাগত সংগ্রামে আমরা রয়েছি।”

আমার পরিচয় আগে থেকে জানতেন বলেই হয়তো সেই হুজুর সুযোগে আমাকে সেদিন ধর্মের কিছু জ্ঞান বিতরণ করে দিয়েছিলেন। একজন মুসলমানই কেবল আরেকজন মুসলমানকে আরবিতে এভাবে সালাম জানানোর অধিকার রাখেন। কে জানে, হবে হয়তো। সীমা লঙঘনের অনৈতিক পন্থায় নাই গেলাম। কিন্তু মনের মধ্যে খুতখুতে রেশটা রয়েই গেলো।

আরেকদিন সেই হুজুরকে সামনে পেয়েই ডান হাত কপালের ডান পাশে ঠেকিয়ে সজোরে বললাম- ‘আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।’ কিন্তু এবারে বিপত্তি বাঁধলো অন্যত্র তিনি হয়তো ভাবলেন তাঁকে কটাক্ষ করা হয়েছে। যদিও এরকম কোন ইচ্ছা বা অভিরুচি ছিলো না। তারপরেও এতোবড়ো বাক্যটাকে সেরকমই মনে হলো। তিনি অনেকটা ক্ষুন্ন মনে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন। হয়তো আমার সম্পর্কে তাঁর স্বনির্মিত ধারণাটাও আপেক্ষিকভাবেই সুখপ্রদ হয়নি।

কিন্তু আমার সমস্যাটা অন্যখানে। ভেতরের যুক্তিবোধ বলছে- পারস্পরিক শান্তি কামনা যদি শুধু মুসলিম-মুসলিমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হতে হয়, তাহলে এর বিপরীতে একজন অমুসলিমের জন্য কি শান্তির বিপরীত কিছুই কামনা করা হবে? ধর্মীয় দৃষ্টিতে দেখলে তাই তো মনে হয়। কেননা অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গতভাবেই আমাদেরকে এটা মানতে হবে যে, প্রতিটা ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী বিশ্বাসী ব্যক্তি তার স্বধর্মকেই সঠিক মনে করেন এবং অন্য ধর্মকে বেঠিক বা ভুয়া ভাবেন। এই সব পরস্পরবিরোধী ধর্মের ভীড়ে আমি তো অমুসলিম হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে আরেকজন মানুষকেই সম্ভাষণ জানাতে উদ্যোগি হয়েছিলাম।

‘নমস্কার’ শব্দটাও তো একটা ধর্মীয় পরিচয় বহন করে। মানুষের মধ্যে ভাব বিনিময়ে ভাষিক পরিচয়টাই তার প্রথম ও প্রধান পরিচিতি। সে ক্ষেত্রে আমি আমাদের মায়ের ভাষা বাংলাতো ব্যবহার করতেই পারি। আমি আবারও বলছি, কোনো ভাষা তো কোনো ধর্ম ও গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। তথাকথিত ধর্ম ও গোষ্ঠীর সর্বগ্রাসী অপক্রিয়া কি আমাদের নিজস্ব অস্তিত্বকেও গ্রাস করে ফেলবে!? এই সব ধর্মীয় কূপম-ুকতার বাইরে দাঁড়িয়ে আমরা কি মানুষের পরিচয়ে একজন মানুষের শান্তি কামনা করতে পারবো না!?

কেননা ঈশ্বর যিশাইয়া ৪৫:৭ পদে বলেছেন; “আমি দীপ্তির রচনাকারী ও অন্ধকারের সৃষ্টিকর্তা, আমি শান্তির রচনাকারী ও অনিষ্টের সৃষ্টিকর্তা; আমি সদাপ্রভূ এই সকলের সাধনকর্তা।” (আমেন)

-লেখক তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব শিক্ষক

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য লিখতে এখানে ক্লিক করুন