ঈদ উল-আযহা : ইসমাইল, ইসহাক এবং কোরবানিতে সুসমাচার

ঘরে ঘরে ঈদ উল-আযহা এর প্রস্তুতি চলছে, চলছে কোরবানির আয়োজন। রাস্তায় বের হলেই দেখা যাচ্ছে কোরবানির গরু। সবার মুখেই আনন্দের ছোয়া। মুসলমান ভাই-বোনদের এই আনন্দ দেখে সত্যিই মন ভরে যায়। এমনকি এই আনন্দে আমার অনেক খ্রীষ্টিয়ান বন্ধুরাও একে অন্যকে “ঈদ মোবারক” বলে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। না, এটা আমার কাছে দোষের কিছু মনে হয় না। মুসলমান বন্ধুরা যখন ঈদ উল-আযহা এর ইতিহাস বলে, দেখা যায় এ তো বাইবেলের ঘটনাই বলা হচ্ছে। পুরাতন নিয়মে ঠিক যেমন করে পশু উৎসর্গ করা হতো, ঠিক সেভাবেই দেয়া হচ্ছে কোরবানি। শুধু পার্থক্য হচ্ছে, “পৃথিবীর সবার পাপের জন্য কোরবানি হওয়ার পরও এই কোরবানির উৎসবে যীশু খ্রীষ্টের জায়গা নেই এবং ইসহাকের জায়গায় ইসমাইলের কথা বলা হচ্ছে”।

একই চরিত্র কিন্তু কাহিনী ভিন্ন

এই উৎসবের নাম ঈদ উল-আযহা, যার অর্থ “ত্যাগের উৎসব”। এই উৎসবের মূল উৎস হচ্ছে কোরানে অব্রাহামের ঘটনা থেকে, যেখানে অব্রাহাম তার ছেলেকে কোরবানি দেয়ার সম্মতি দেয়। যদিও কোরানে নির্দিষ্ট করে বলা নেই অব্রাহাম তার কোন ছেলেকে কোরবানি দেয়ার জন্য নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মুসলমান ভাইয়েরা বিশ্বাস করে অব্রাহাম ইসমাইলকে পাহাড়ে কোরবানি করার জন্য নিয়ে গিয়েছিল, ইসহাককে না। আল্লাহ্-র প্রতি অব্রাহামের এই বাধ্যতাকে স্মরণ করে মুসলমান ভাইয়েরা পশু কোরবানি দেয় এবং কোরবানির মাংস তিন ভাগ করে যথাক্রমে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং গরিবদের মাঝে ভাগ করে দেয়।

মুসলমানেরা আরও বিশ্বাস করে শয়তান অব্রাহামকে লোভ দেখায় যেন অব্রাহাম আল্লাহ্‍র অবাধ্য হয়। কিন্তু অব্রাহাম পাথর মেরে শয়তানকে তাড়িয়ে দেয়। এই কথা স্মরণ করেই হজ্জ্ব পালনের সময় মিনায় পাথর নিক্ষেপ করা হয়।

বাইবেলে অব্রাহামের ঘটনা লক্ষ্য করলে দেখা যায় এই ঘটনার সাথে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে (আদি ২২:১-১৯), সেখানে ঈশ্বর সরাসরি ইসহাককে উৎসর্গ করার কথা উল্লেখ করেন এবং পরে ঈশ্বর তার একমাত্র পুত্রকে উৎসর্গ করার প্রতিজ্ঞা করেন।

ঈদ উল-আযহা-তে সুসমাচার প্রচার

ইসলাম এবং খ্রীষ্টিয়ান বিশ্বাসে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু এই উৎসবের মূল ঘটনার অনেক মিল থাকায় এই সময়ে সুসমাচার প্রচারের সুযোগ নিঃসন্দেহে বৃদ্ধি পায়। তাই ঈদ উল-আযহায় এইভাবে সুসমাচার প্রচার করতে পারেনঃ

স্বীকৃতির বিষয়

খ্রীষ্টিয়ান এবং মুসলমান উভয়েই বিশ্বাস করে অব্রাহাম একমাত্র সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করতেন এবং তার বাধ্য ছিলেন। ঈদ উল-আযহায় মুসলমানদের চিন্তার মূল কেন্দ্রবিন্দু থাকে অব্রাহামের এই বিশ্বাস এবং বাধ্যতা। খ্রীষ্টিয়ানেরা এই আলোচনায় সামিল হতে পারেন এবং বাইবেলের সত্য ঈশ্বরের প্রতি আলোকপাত করতে পারেন। কারণ অব্রাহামের এই কোরবানির ঘটনা মূলত সমস্ত মানুষের জন্য যীশু খ্রীষ্টের কোরবানির ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে।

পাপের প্রায়শ্চিত্ত

বাইবেলের অব্রাহামের ঘটনায় সুস্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, পাপের ক্ষমার জন্য কোরবানি বা উৎসর্গ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ঘটনায় মোট পাঁচবার উৎসর্গ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে (আদি ২২:৩, ৬, ৭, ৮, ১৩)। লেবীয় ১:৩-১৭ পদে বলা হয় পাপ ঢাকবার জন্য সম্পূর্ণ নিখুঁদ পশু উৎসর্গ করার কথা।

কারণ রক্তেই থাকে প্রাণীর প্রাণ। সেইজন্যই তোমাদের প্রাণের বদলে আমি তা দিয়ে বেদীর উপরে তোমাদের পাপ ঢাকা দেবার ব্যবস্থা দিয়েছি। রক্তের মধ্যে প্রাণ আছে বলেই তা পাপ ঢাকা দেয়। -লেবীয় ১৭:১১।

আদি ২২:১৪ পদে বলে “সদাপ্রভু যোগান”, অব্রাহামের কোরবানির জন্য তিনি নিজেই পশু যুগিয়ে দিয়েছিলেন।

চূড়ান্ত কোরবানি

বাইবেলের অব্রাহামের এই ঘটনা উল্লেখ করার পর খ্রীষ্টের মূল সুসমাচার প্রচার করতে পারেন। অব্রাহাম এবং ইসহাকের এই ঘটনা মূলত যীশু খ্রীষ্টের ক্রুশে উৎসর্গ হবার ঘটনাকেই ইঙ্গিত করে। যেমন ইসহাকের জায়গায় একটি পশু কোরবানি দেয়া হয়েছিল এবং সেই কোরবানির পশু ঈশ্বর নিজেই যোগান দিয়েছিলেন,  তেমনি আমাদের সবার পাপের জন্য তাঁর একমাত্র পুত্রকে কোরবানি দিয়েছেন। যীশু খ্রীষ্টের মৃত্যু এবং পুনরূত্থানই আমাদের সকলের পাপের একমাত্র মুক্তির উপায়।

ইব্রীয় ১০:১-১০ অনুযায়ী “একমাত্র যীশু খ্রীষ্টের রক্তদ্বারা পাপের ক্ষমা সম্ভব। ঠিক যেমন ঈশ্বরের দেয়া একটি ভেড়া উৎসর্গের মাধ্যমে ইসহাকের জীবন বেঁচেছিল, এটা তারই একটি প্রতিচ্ছবি (ইব্রীয় ১১:১৭-১৯)। কারণ প্রভু যীশুর মৃত্যু এবং পুনরূত্থানকে বিশ্বাস করা এবং মুখে স্বীকার করার মাধ্যমেই পাপ থেকে উদ্ধার পাওয়া যায় (রোমীয় ১০:৯-১০)।  যীশু খ্রীষ্টই “ঈশ্বরের মেষ-শিশু, যিনি মানুষের সমস্ত পাপ দূর করেন” (যোহন ১:২৯)। আসুন প্রার্থনা করি, যেন খ্রীষ্ট বিশ্বাসীরা এই ঈদ উল-আযহায় নির্ভয়ে প্রচার করে যে, যীশু খ্রীষ্টই সত্য এবং চূড়ান্ত কোরবানি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

নতুন লেখা

ঈশ্বর আপনার সঙ্গে চলছেন

https://www.youtube.com/watch?v=GhqCxrHrYvs আমরা এই সময়ে করোনার আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। একই সঙ্গে আমরা বাংলাদেশে ভয়াবহ আম্পান ঝড়ের মোকাবেলা করলাম। করোনার এই...

গান বই -এর এন্ড্রয়েড এ্যাপ

গীর্জায় বা যে কোন ধর্মীয় সভায় বাইবেলের পাশাপাশি গান বই -এর কোন বিকল্প নেই। বর্তমান প্রজন্মে প্রায় সবার ফোনেই...

জেলখানা ও ভেঙে যাওয়া জাহাজ (পৌল)

পৌল যিরূশালেমে এসেছেন বেশী দিন হয় নি, কিন্তু এরই মধ্যে পৌলকে নিয়ে আরেকটি হুলস্থুল শুরু হয়ে যায়। যিহূদীরা ভেবেছিল...

পৌলের প্রচার যাত্রা

সিরিয়া দেশের আন্তিয়খিয়া শহরে অনেক লোক যীশু খ্রীষ্টকে বিশ্বাস করে খ্রীষ্টিয়ান হচ্ছিল। তাই সেখানে যীশুর বিষয় শিক্ষা দেবার জন্য...

পিতর ও কর্ণীলিয়

এদিকে পুরোহিতদের অত্যাচারে যারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল পিতর তাদের কাছে গিয়ে দেখাশুনা করতে লাগলেন। তিনি যখন যীশুর বিষয়ে...

আপনার ভাল লাগতে পারেএকই লেখা
আপনার জন্য লেখা