বাইবেলের গল্প

যোষেফের প্রতি ঈশ্বরের আশির্বাদ

যোষেফ ছিল যাকোবের সবচেয়ে প্রিয় ছেলে। যাকোবের ছিল বার ছেলে। তাদের নাম: রূবেণ, শিমিয়োন, লেবি, যিহূদা, ইষাখর, সবূ্লূন; গাদ ও আশের; দান ও নপ্তালি; এবং যোষেফ ও বিন্যামীন।
বিন্যামীনের জন্মের সময় রাহেল মারা গেল। যাকোব রাহেলকে খুব ভালবাসতেন। তিনি যোষেফকে একটি সুন্দর জামা বানিয়ে দিলেন। এরকম জামা আসলে তার সবচেয়ে বড় ছেলে রূবেনের পাবার কথা ছিল। এতে তার ভাইয়েরা যোষেফকে হিংসা করতে শুরু করে। এছাড়া যোষেফ একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন- তার বাবা ও ভাইয়েরা তাকে উবুর হয়ে প্রণাম করছে- আর সেজন্য তাকে তারা আরও হিংসা করতে লাগল। একদিন যাকোব যোষেফকে তার ভাইয়েরা ও পশুপালগুলো ভাল আছে কিনা তার খোঁজ-খবর আনতে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু তার ভাইয়েরা যখন দেখল যে, যোষেফ আসছে তখন তারা তাকে মেরে ফেলবে বলে ঠিক করল। বড় ভাই রূবেণ তাকে বাঁচাবার জন্য অন্য ভাইদের বুঝাল যেন সেখানে তাকে মেরে ফেলা না হয়।

দাস হিসাবে বেচে দেয়া হল

রূবেণ অন্য ভাইদের বললেন, ‘ঐ শুকানো কুয়াটিতে ওকে ফেলে দেও।’ তাঁতে সবাই রাজি হল। কিন্তু রূবেণ যখন ভেড়াগুলো দেখবার জন্য একটু দূরে গিয়েছিল টিক সেই সময় একদল ব্যবসায়ী সেখান দিয়ে মিসরে যাচ্ছিল। অন্য ভাইয়েরা যোষেফকে কুয়া থেকে তুলে বিশটি রূপার টাকায় তাদের কাছে বিক্রি করে দিল। রূবেণ যখন ফিরে এল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

তারা যোষেফের সেই সুন্দর জামাটি নিয়ে ছাগল কেটে তাঁতে রক্ত মাখাল। তারপর তারা বাড়ীতে ফিরে এসে তাদের বাবাকে সেটা দেখাল। যাকোব মনের দুঃখে অনেক কান্নাকাটি করলেন আর ভাবলেন যে, বনের পশুরা যোষেফকে টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেলেছে। তিনি আর সান্ত্বনা পাচ্ছিলেন না।
এর মধ্যে ঐ ব্যবসায়ীরা যোষেফকে নিয়ে দাস হিসাবে পটিফরনামে মিসরের এক সরকারী অফিসারের কাছে বিক্রি করে দিল। যোষেফ এখন বিদেশের বাড়ীতে একজন দাস, কিন্তু সে একা নয়। ঈশ্বর তার সঙ্গে সঙ্গে আছেন।

যোষেফ দেখতে খুবই সুন্দর ছিলেন বলে পটিফরের স্ত্রী যোষেফকে ভালবেসে ফেলল। কিন্তু যোষেফ তার ভালবাসায় সাড়া দিলেন না। এতে পটিফরের স্ত্রীর খুব রাগ হল এবং তার স্বামীর কাছে যোষেফের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করল। সে বলল যে, যোষেফ তার মান হানি করতে তার ঘরে এসেছিল।

রাজার জেলখানায়

এ কথা শুনে পটিফর খুবই রেগে গেল। তাই সে যোষেফকে রাজার জেলখানায় বন্দি করে রাখল। কিন্তু ঈশ্বর তখনও তার সঙ্গে সঙ্গে ছিলেন। জেলখানায় সব বন্দীদের ভার তার উপর দেওয়া হল। সেই বন্দীদের মধ্যে একজন মিসরের রাজার প্রধান পানীয় পরিবেশক ও আরেকজন ছিল রাজার প্রধান রুটিকার।

একদিন রাতে তারা দুইজনেই একটি অদ্ভুদ স্বপ্ন দেখল। পরদিন সকালে যোষেফ তাদের খাবার দিতে এসে তাদের চোখেমুখে ভয়ের ছায়া দেখতে পেলেন। তারা ভাবছে, এই স্বপ্নের মানে কি? সেই সময় মিসরের লোকেরা স্বপ্ন দেখলে তা বেশ গুরুত্ব সহকারেই গ্রহণ করত। তারা মনে করত, স্বপ্নের নিশ্চয়ই কোন না কোন মানে আছে।

যোষেফ, তাদের বললেন, ‘ঈশ্বর আমাদেরকে স্বপ্নের মানে বুঝিয়ে দিতে পারেন।’ তাই রাজার দরবারের পানীয় পরিবেশক ও রুটিকার দুজনেই তাদের স্বপ্নের অর্থ বলে দিলেন।
পানীয় পরিবেশক স্বপ্নে দেখেছিল যে, একটি আঙ্গুর লতার তিনটি ডাল। সে সেই ডাল থেকে আঙ্গুর তুলে তা থেকে রস বের করে রাজার হাতে দিচ্ছে। যোষেফ বললেন, ‘তিন দিনের মধ্যে রাজা আপনাকে ছেড়ে দেবেন এবং আপনি আপনার আপনার আগের চাকরি ফিরে পাবেন। যখন আপনি ছাড়া পাবেন তখন দয়া করে আমার কথা রাজাকে বলে আমাকে সাহায্য করবেন যেন আমি এই জেলখানা ছাড়া পেতে পারি। রাজার পানীয় পরিবেশক বলল, ‘হ্যাঁ, আমি করব।’
রুটিকার স্বপ্ন দেখেছিল যে, রাজার জন্য সে তিন ঝুড়ি রুটি তার মাথায় বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু পাখিরা তা খেয়ে ফেলল।
যোষেফ বললেন, ‘তিন দিনের মধ্যে রাজা আপনাকে এই জেলখানা থেকে বের করে নিয়ে আপনার মাথা কেটে ফেলবেন।’
যোষেফ যেমনটি বলেছিলেন টিক তেমনটিই ঘটল। এদিকে পানীয় পরিবেশক যোষেফের কাছে যে প্রতিজ্ঞা করেছিল সে কথা ভুলে গেল।

রাজা স্বপ্ন দেখলেন

এর দু’বছর পর, রাজা একটি অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন, কিন্তু কেউ তার অর্থ করতে পারল না। তখন পানীয় পরিবেশকের যোষেফের কথা মনে হল। আর তখনই, যোষেফকে জেলখানা থেকে বের করে রাজার কাছে নিয়ে আসা হল। রাজা যোষেফের কাছে তার স্বপ্নের কথা বললেন।
রাজা একদিন নীল নদের পাড়ে দাড়িয়ে ছিলেন, তখন সাতটি মোটাসোটা গরু নদী থেকে উঠে এল। এরপর আরও সাতটা রোগা পাতলা গরু নদী থেকে উঠে এল। কিন্তু সেই রোগা পাতলা গরুগুলো সেই মোটাসোটা গরুগুলোকে খেয়ে ফেলল!

ঈশ্বর যোষেফকে সেই স্বপ্নের অর্থ বুঝিয়ে দিলেন।
যোষেফ রাজাকে বললেন, মিসর দেশে সাত বছর খুব ভাল হবে এবং এরপরে সাত বছর একেবারেই ফসল হবে না। তখন দেশে দুর্ভিক্ষ হবে। এখন আপনার বুদ্ধিমানের মত কাজ করা চাই। প্রথম সাত বছর অনেক ফসল হবে তা আপনি জমা করে রাখবেন যেন অভাবের বছরগুলোতে আপনার লোকেরা খাবারের অভাবে মারা না যায়।’ স্বপ্নের এই অর্থ শুনে রাজা খুব খুশি হলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে, যোষেফ ঈশ্বরের লোক। শস্য জমা করে রাখবার জন্য হয়তো তার চেয়ে ভাল লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই রাজা তার হাতের আঙ্গুল থেকে আংটি খুলে যোষেফের আঙ্গুলে এবং তার গলায় সোনার হার পরিয়ে দিলেন। আর তাকে সারা মিসর দেশের দ্বিতীয় পদ দিলেন। প্রথম সাত বছর মিসরে  খুব ভাল ফসল হল, কিন্তু সাত বছর পরে যোষেফ যেমন বলেছিলেন তেমনি জমিতে ফসল বেশি হল না এবং আশেপাশের দেশেও খাবার ছিল না। আর মিসরে যোষেফ শস্যের গুদাম খুলে দিলেন এবং লোকদের কাছে শস্য বিক্রি করতে লাগলেন।
এমন সময় কনান দেশও খাবারের অভাব দেখা দিল। তাই যাকোব তার ছেলেদের শস্য কিনে আনার জন্য মিসরে পাঠাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। শুধু বিন্যামিনকে তিনি নিজের কাছে রেখে দিলেন, অন্য ছেলেদের সঙ্গে তাকে পাঠালেন না।

যোষেফের ভাইদের আগমন

যাকোবের দশজন ছেলে মিসরে যোষেফের কাছে গিয়ে শস্য কিনতে গেল। তারা তাদের ভাই যোষেফকে চিনতে পারল না। কিন্তু যোষেফ ঠিকই তাদের দেখে চিনতে পারলেন। তিনি দেখতে চাইলেন তারা আগের মতই নিষ্ঠুর আছে কিনা। তাই তিনি তাদের সঙ্গে নিষ্ঠুর ব্যবহার করলেন।
তিনি বললেন, ‘আপনারা তো গোয়েন্দা!’ তিনি তাদের সবাইকে জেলে পুরে রাখলেন। তিন দিন পরে তাদের ছেড়ে দিলেন। কিন্তু তিনি তাদের প্রতিজ্ঞা করালেন যে, তারা যখন আবার আসবে তখন যেন বিন্যামিনকে নিয়ে আসে। তারা যেন আবার আসে সেজন্য শিমিয়োনকে আবার বন্দী কর রাখলেন। তারপর তিনি তার চাকরদের আদেশ দিলেন যেন তারা শস্যের সঙ্গে বস্তায় করে তাদের টাকাও ফেরত দিয়ে দেয়। দেশে ফিরে বস্তা খুলতেই সব বস্তায় তারা টাকা দেখে তো অবাক! এবার তারা অন্যরকম দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেল।

মিসর থেকে কিনে আনা শষ্য শেষ হয়ে গেলে পর যাকোব দ্বিতীয়বার ছেলেদের মিসরে পাঠালেন খাবার কিনে আনতে।
এবার তার বিন্যামিনকে সঙ্গে নিয়ে মিসরের শাসনকর্তার কাছে গেল। যোষেফ যখন বিন্যামীনকে তাদের সঙ্গে দেখতে পেলেন তখন তার চোখ জলে ছল ছল করছিল কিন্তু তিনি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিলেন। তার ভাইয়েরা তার সামনে উবুড় হয়ে তাকে প্রণাম করল।
যোষেফ বললেন, ‘আপনাদের বুড়ো বাবা কেমন আছেন? বিন্যামীনকে দেখিয়ে বললেন- এই-ই কি আপনাদের ছোট ভাই?’
এরপর যোষেফের লোকেরা তাদের জন্য খাবার প্রস্তুত করলে পর তারা খেতে বসল। যখন খাবার আনা হল তখন অন্যান্য ভাইয়ের চেয়ে বিন্যামিনকে পাঁচগুণ বেশী দেওয়া হল। কিন্তু তখনও যোষেফ তাদের তার পরিচয় তাদের কাছে প্রকাশ করেন নি।

পরের দিন সকালে, যখন তার চাকরেরা তাদের বস্তায় শস্য ভরে দিচ্ছিল তখন যোষেফ তাদের বললেন তার নিজের রূপার পেয়ালাটা যেন বিন্যামীনের বস্তায় দিয়ে দেয়।
তার ভাইয়েরা শস্য নিয়ে তখনও শহর ছেড়ে বেশী দূরে যায়নি, তখন যোষেফের লোকেরা গিয়ে তাদের ধরে ফেলল। তারা বলল, ‘আমরা একজন চোর খুঁজছি যে আমাদের মালিকের রুপার বাটিটি চুরি করেছে।’তারা যখন বিন্যামিনের বস্তা খুলল তখন তার বস্তায় সেটি পাওয়া গেল। এতে তার ভাইয়েরা ভীষন ভয় পেল। তারা আবার শহরে ফিরে গিয়ে যোষেফের পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইতে লাগল।
যোষেফ তাদের পরীক্ষা করবার জন্য বললেন, ‘যার বস্তার মধ্যে পেয়ালাটা পাওয়া গেছে সে আমার দাস হবে। বাকীরা চলে যেতে পারো।’
কিন্তু তার ভাইয়েরা সেই কথায় রাজী হল না। যিহূদা বলল, ‘যদি বিন্যামীন আমাদের সঙ্গে ফিরে না যায় তবে আমাদের বাবা শোক করতে করতে মরে যাবেন। আমি বাবার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি যে, তাকে আমি নিরাপদে ফিরিয়ে নিয়ে যাব। বিন্যামিনের পরিবর্তে আমাকে আপনার দাস করে রাখুন।’

এই কথা শোনার পর যোষেফ আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না। তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।
তিনি তাদের বললেন, ‘আমি যোষেফ, আমার বাবা কি এখনও জীবিত আছেন?’ এই কথা শুনে তার ভাইদের মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেল।
কিন্তু যোষেফ বললেন, ‘ভয় করো না। ঈশ্বরই আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন যেন তোমাদের জীবন রক্ষা করতে পারি। আরও পাঁচ বছর ফসল হবে না। তোমরা বাড়ী ফিরে গিয়ে সবাইকে নিয়ে মিসরে এস, তোমরা আমার কাছে গোশন এলাকায় বাস কর।’ এরপর তিনি তাদের সবার গলা জড়িয়ে ধরে অনেক কাঁদলেন।
তারা ফিরে গিয়ে তাদের বুড়ো বাবা যাকোবকে সবকিছু খুলে বলল। যাকোব সব ঘটনা শুনে তার সব পরিবার পরিজন ও সব ধন-সম্পদ নিয়ে কনান দেশ থেকে মিশরে চলে এলেন। যোষেফ তার বাবাকে রাজবাড়ীতে এনে রাজার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এরপর তারা গোশনে, মিশরের সবচেয়ে ভাল এলাকায় বাস করতে লাগলেন।

রেডিও