প্রবন্ধ

প্রকৃত শিক্ষক ও আদর্শ পরিবার

কবি বলেছেন, বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র, নানান জিনিস শিখছি দিবারাত্র। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শিখতে হয়, যে প্রকৃত শিক্ষা গ্রহন করে তাঁর মৃত্যু নাই। মানুষকে আত্ম-শক্তি অর্জন করতে হলে শিক্ষিত হতে হবে সুতরাং শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ আত্ম বিশ্বাসে বলিয়ান হবে। আত্ন শক্তি মানুষের একটি সুপ্ত প্রতিভা, শিক্ষার মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের অন্তরে যেন আত্মশক্তি বিকশিত হয় তার ব্যাবস্থা করা দরকার। কারন আত্ম শক্তিবিহিন মানুষ পর মুখাপেক্ষী ছাড়া আর কিছুই নয়। মানব দেহের অঙ্গ প্রতঙ্গের মধ্যে মেরুদন্ড গুরুত্বপূর্ন উপাদান। এ উপাদান ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করা অর্থহীন, তেমনি শিক্ষা ছাড়া ব্যাক্তি, সম্প্রদায়, জাতির উন্নতির আশা করাও যায়না। কারন মানুষের মেরুদন্ড না থাকলে শরীর এক টুকরো মাংস পিন্ড মাত্র। সোজা হয়ে হাটঁতে পারবে না। আধুনিক বিশ্ব শক্তি কর্মময় প্রভাবে প্রভাবিত। আর এশক্তি ও কর্ম মানুষ শিক্ষার মাধ্যমে লাভ করেছে। মানুষ তার জ্ঞান বুদ্ধি দ্বারা পৃথিবীর অন্যান্য প্রানীর উপর নিয়ন্ত্রন রেখেছে। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে মানুষ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। পঙ্গু লোক যেমন চলতে পারেনা তেমনি অশিক্ষিত ব্যাক্তি, জাতি ও অস্তিত্বহীন হয়ে পরবে। এ সব বিষয় বিবেচনায় মানুষ গ্রন্থাগার ও বিশ্ববিদ্যালয় নির্মান করছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় শিক্ষার জন্য সহজ উপায় নিয়ে গবেষনা চলছে। ব্যাক্তি, সমাজ, জাতির উন্নতির পূর্বশর্ত হচ্ছে শিক্ষা; তাই ঈশ্বরও অনাদিকাল থেকে মানুষকে শিক্ষা দিচ্ছেন যা পবিত্র বাইবেলে দেখতে পাই। তার মধ্যে পিতা-মাতা, পরিবারের শিক্ষার গুরুত্ব অত্যাধিক।

শিক্ষার ক্ষেত্রে মন্ডলীঃ

মন্ডলীতে একটি শিশু সান্ডেস্কুলে সপ্তাহে ১-৩০ মিনিট অথবা পিতা-মাতার সঙ্গে উপাসনায়, পারিবারক প্রার্থনা সভায় অংশ গ্রহন, শিশু ক্যাম্পে যোগদানের প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহন জাগতিক ও আধ্যাত্মিকভাবে বিকশিত, আলোকিত হয়। কিন্ত পরিবার ও পিতা-মাত সান্ডেস্কুলে পাঠানো ও নিজেরাসহ মন্ডলীতে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক কর্মসূচিতে অংশ গ্রহন না করায় ছেলে মেয়েরা পিতা-মাতার সাথে মন্ডলীর পালক্সহ অন্যান্যদের বিষয়ে মন্দ সমালোচনা করতে শেখে, ভাল দিকগুলোতেও আমাদের মন্ডলীতে আছে তা অন্যদের বলা দরকার। বর্তমানে মন্ডলীতে শিশুদের কেবল ধর্মী শিক্ষায়ই দেওয়া হয় না। ব্যায়ামের মাধ্যমে গানসহ মানসিক শিক্ষা দানের ও খেলার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার অনেক সুযোগ আছে ফলে অতি সহজেই শিশুরা আজ প্রভু যীশুকে ব্যাক্তিগত ত্রানকর্তা হিসেবে গ্রহন করেছে। শিশুদের জন্যে দাঁড় করানোর প্রথম ও প্রধান সুযোগের স্থান মন্ডলী। মন্ডলীর শিশুদের প্রতি যে দায়িত্ব কর্তব্য আছে তা অবহেলা করলে আগামী প্রজন্ম উপাসনায় বিমুখ ও আরও বিপথগামী হবে। তাই এ বিষয়ে এখনই মন্ডলীকে শিশুদের গন্তব্য পথে পরিচালিত করার জন্য পরিবার, পিতা-মাতার সহযোগিতায় মানুষ করে তোলার জন্য এগিয়ে আসতেই হবে।

স্কুলের ভূমিকাঃ

শিশুরা এসেমব্লীর মাধ্যমে শৃঙ্খলাবোধ, নিয়ম-নীতিসহ একত্রে থাকা, নিয়মিত পাঠ গ্রহন করা, নিয়মিত স্কুলে যোগদান করা ও চরিত্র গঠনের সহায়ক ভূমিকা রাখে। শিক্ষকের কর্তব্য ভালবাসা, আনন্দ দান ও উপকরনের মাধ্যমে ধৈর্যসহ শিক্ষা প্রদান করা; প্রহার ও ভয় প্রদর্শন না করা; কিন্ত সর্বদাই উৎসাহ প্রদান করা যাতে ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে প্রার্থনা ও আদর্শবান হওয়ার শিক্ষা দান, পাঠ্য পুস্তকের শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার অনুপ্রেরনা পায়। স্কুলের পরিবেশ ও শিক্ষা একটি মানুষ সারা জীবন মনে রাখতে পারে, সেই আদর্শে অনুপ্রানিত হয়ে ভবিষ্যৎ জীবনে সততাসহ শৃঙ্খলায় জীবন যাপন করে পাপ দুর্নীতি থেকে দূরে থেকে চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এক সাথে মিলে মিশে থাকার অনুপ্রেরনা শিশুরা স্কুলেই পায়। ভবিষ্যৎ জীবনে সে কি করবে আর কি হবে তার প্রস্তুতি শিশু স্কুলেই শিক্ষক ছাত্রদের মাঝে প্রকাশ করতে আরম্ভ করে, পরবর্তী জীবনে সে তা বাস্তবায়িত করে। যে স্কুলে নিয়মিত বাইবেল পাঠ ও প্রার্থনা করে আরম্ভ করে, পরবর্তী জীবনে সে তা বাস্তবায়িত করে। যে স্কুলে নিয়মিত বাইবেল পাঠ ও প্রার্থনা করে প্রকৃত শিক্ষক ও আদর্শ পরিবারআরম্ভ করে ভবিষ্যৎ জীবনে ঐ অভ্যাসগুলো তাদের জীবনে সুন্দর ও পবিত্র জীবনে চলার চেতনা ধরে রাখতে সক্ষম হবে। স্কুলে জাগতিক শিক্ষার সাথে আধ্যাত্মিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে উঠলে মানুষের জীবন সত্যিকারের আলোকিত না হয়ে পারে না।

শিক্ষার ক্ষেত্রে পরিবারঃ

একটি শিশু বা মানুষ ২৪ ঘন্টার মধ্যে শিশু ৪ ঘন্টা স্কুলে, পূর্ণ বয়স্ক লোক কর্মস্থলে ৮ ঘন্টা, অন্যান্যরা অবসরে আড্ডায় ২ ঘন্টা বাইরে থাকতে পারে; অবশিষ্ট অধিকাংশ সময় ঘরে পরিবারে অবস্থান করে। পরিবারের বয়স্কদেরে কাছ থেকে শুনে, দেখে তাদের শিক্ষা নিয়ে বই পুস্তক পড়াশুনা করে একজন অন্যজনের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে, যাকে বাস্তব শিক্ষা বলা যায়। আগের দিনের প্রবাদ কথায় প্রাচীনদের কাছ থেকে শুনতাম, “রাজ বাড়ির বিড়ালটাও আড়াই অক্ষর শিখতে পারে”। পরিবেশ, অবস্থানও শিক্ষা দেয়। আমার বাইবেল অধ্যয়ন ও গবেষনায় দেখেছি যে পরিবারের চেয়ে বড় ভাল কোন বিদ্যালয় কোথায় নাই। জাগতিক ও আধ্যাতিক জ্ঞান বিজ্ঞানের অনুপ্রেরনার সুযোগ পরিবারের মা, বাবা, দাদা, ঠাকুরমা, ঠাকুরদাদা, বড় ভাই, দিদিসহ ছোট ছোট শিশুদের কাছ থেকেও আমাদের শিখতে হয়। পরিবারে বাইবেল অধ্যয়ন, আরাধনা ও প্রার্থনা না হলে মন্ডলীতে, সমাজে ও জাতীয় জীবনে শক্তিশালী ভুমিকা রাখা যায় না। পরিবার ও ব্যাক্তি জীবন আদর্শবান না হলে পিতা যে ভুল করে থাকে পুত্রও সেই ভুল, মন্দতা পরবর্তী সময়ে করে থাকে। কেউ হয়তো বলবেন জেনেটিক কিন্ত আধ্যাত্মিক আদর্শের অভ্যাসের কারনে জেনেটিক মন্দ বিষয়ও পরিবর্তীত হতে পারে। পরিবারের শাসন, শিক্ষা, ভালবাসা আদর্শের অভ্যাস ও ঈশ্বর ভয় না থাকার কারনে অনেক যুবক যুবতীরা বর্তমানে বিপথগামী হচ্ছে এর জন্য পরিবারই সম্পূর্ন দায়ী। উপাসনা ও প্রার্থনা সভায় অন্য কাজে অন্য কোথাও যাওয়াও পরিবারের আদর্শের আধ্যাত্মিক জীবনের অন্তর্গত। কোন বিষয়টি প্রথম ও প্রধান তা পরিবার ও পিতা-মাতার কাছ থেকে শিক্ষা পেয়ে আদর্শবান হতে প্রার্থনার গুরুত্ব দিতে শিখে ও ঈশ্বর নির্ভরশীল হয়ে উঠে।

প্রকৃত শিক্ষক ও বিশ্বের বড় ভাল বিদ্যালয়ঃ

দ্বিতীয় বিবরন ১১:১৮-২১ পদে বলা হয়েছে যে, “অতএব তোমরা আমার বাক্য সকল আপন আপন হৃদয়ে ও আপন প্রানে রাখিও এবং চিহ্নরূপে আপন আপন হস্তে বাঁধিয়া রাখিও এবং সে সকল ভূষনরূপে তোমাদের দুই চক্ষের মধ্যে থাকিবে। আর তোমরা গৃহে উপবেশন ও পথে গমন কালে এবং শয়ন কালে ও গাত্রোত্থানকালে ঐ সকল কথার প্রসঙ্গ করিয়া আপন আপন সন্তানদিগকে শিক্ষা দিও। আর তুমি আপন গৃহ দ্বারের পার্শ্বেকাষ্ঠে ও আপন দ্বারে তাহা লিখিয়া রাখিও। তাহাতে সদাপ্রভু তোমাদের পিতৃপুরুষদিগকে যে ভূমি দিতে দিব্য করিয়াছেন, সেই ভূমিতে তোমাদের আয়ুঃ ভূমন্ডলের উপরে আকাশমন্ডলের আয়ুর ন্যায় বৃদ্ধি পাইবে।”এই সুন্দর পদ্ধতিতে সন্তানদের শিক্ষা দিতে প্রভু আদেশ করেছেন। আমরা কি তা অনুসরন ও অনুকরন করে আমাদের সন্তানদের আয়ুঃ ভূমন্ডলের উপরে আকাশমন্ডলের ন্যায় বাধ্যতায় বৃদ্ধির চেষ্টা করছি?
হিতোপদেশ ২২:৬ পদে শলোমন বলেছেন, “তোমরা বালককে গন্তব্য পথ শিক্ষা দাও”। অনেক পিতা-মাতা আজ সন্তানদের শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। ফলে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার দিকে তাদের সন্তানগন অগ্রসর হতে পারছে না। গন্তব্য পথ কোথায়? কিভাবে পৌঁছাতে হবে তা জানতে হবে শৈশবে। নরম ডাল যে কোন দিকে ফিরিয়ে দেওয়া যায় কিন্ত সেটি বড় হলে তা আর সম্ভব হয় না। তাই বালককেই তার পিতার শিক্ষা দিতে হবে, তার জাগতিক আধ্যাত্মিক শিক্ষার আদর্শ, ঈশ্বর ভয় ও নৈতিকতা শিক্ষা দিতে হবে। তা হলে প্রাচীন হলেও ঐ অভ্যাস ও শিক্ষা সন্তান ত্যাগ করে দুর্নীতিপরায়ন বা পাপের পথে বিপথগামী মানুষ হবে না।
ইফিষীয় ৬:৪ পদে সাধু পৌল বলেছেন যে, পিতারা তোমরা আপন আপন সন্তানদিগকে প্রভুর শাসনে চেতনা প্রদানে মানুষ করিয়া তোল। মাতার ব্যাবস্থা ছাড়িও না –হিতোপদেশ ১:৮ পদ। খ্রীষ্টীয় ও জাগতিক শিক্ষায় মানুষ করে তোলার দায়িত্ব বাইবেল পিতা-মাতাকেই দিয়েছেন। আমার জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতায় জানতে পেরেছি যে, পিতার চেয়ে আর কোন ভাল শিক্ষক সন্তানকে জাগতিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার ভাল করিগর প্রকৃত শিক্ষক ও আদর্শ পরিবারদ্বিতীয় জন আর কেহ নাই। অনেক পিতা-মাতা আছেন যারা কেবল জাগতিক শিক্ষা দেন, আবার অনেক পিতা-মাতা আছেন যারা আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেন; এই দুই শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই যথার্থ চেতনা লাভ করে আমাদের সন্তানেরা প্রকৃত যোষেফ, বার্নবা, দানিয়েলের মত জীবন্ত ঈশ্বরের সেবক হয়ে উঠবে; যাদেরকে বিশ্ববাসী বিশেষ মানুষ হিসেবে দেখবে।

উপসংহারঃ

২ তীমথিয় ১:৫ ও ২ তীমথিয় ৩:১৪-১৭ পদে আমরা দেখতে পাই, লোয়ীর তীমথিকে শিক্ষা দিয়ে ঈশ্বরের লোক, পরিপক্ক, সমস্ত সৎ কর্মের জন্য সুসজ্জীভূত করে আদর্শ যুব পালকে পরিনরত করেছেন। তীমথির দিদিমা লোয়ীর মত আমাদের সন্তানদের পরিপক্ক, ও সুসজ্জীভূত করতে চাইলে পবিত্র শাস্ত্রকলাপ পিতা-মাতাসহ আপন জনের নিকট থেকেই শিখতে হবে; আর তা হলেই বাক্যে, আচার-ব্যবহারে, প্রেমে, বিশ্বাসে, শুদ্ধতায় বিশ্বাসী বীরগনের ন্যায় আদর্শ হবে। এই ভাবেই পরিবার, মন্ডলীতে অনেক তীমথির জন্ম হবে এবং বাইবেলের শিক্ষা বাস্তবায়িত হবে। তাই আমি সম্মানিত পাঠকদের নিকটে বিনীত অনুরোধ করি, আসুন আমরা সকলে বাইবেলের পিতা হই যে পিতার চেয়ে আর কোন উত্তম শিক্ষক নাই, এমন পরিবার গড়ি যে এর চেয়ে বিশ্বে কোন ভাল বড় বিদ্যালয় নাই।
সংগ্রহঃ নবযুগ(পালক চিরন্তন বৈদ্য)

রেডিও